মেয়েটি তার ছোট্টবেলার ফ্রক কোথাও খুঁজে পায়নি
অমানিশা
একটু জিরিয়ে নিই।
একটু জিরিয়ে নিই?
কথাটা বাতাসের সাথে মিশে হারিয়ে যাবার আগেই রতির কান পর্যন্ত পৌঁছাতে সময় নিল। তবুও কি মনে করে যেন সে একবার পিছন ঘুরে তাকালো। দেখলো বৃষ্টির ফোঁটা আমনের শরীর ছেড়ে তার দিকে ক্রমে এগিয়ে আসছে। রাতের ঝাপসা আলোয় বৃষ্টির কুয়াশায় আমন হাত নেড়ে নেড়ে কি যেন বলতে গিয়ে থেমে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আমন যেন বোবা। কোনদিন যেন সে কথা বলতে জানতোনা। হঠাৎ করেই আমনকে দূর অতীতের কেউ মনে হচ্ছে। বর্তমানের কোথাও রতির জীবনে আমনের কোন অস্তিত্ব নেই। রতি বিড়বিড়িয়ে কি যেন বলছে। অমানিশা। গভীর রাত। রাত মানে তার কাছে শহরের রাত। কোনদিন সে গ্রামের রাত দেখে নাই। রাত আর শহর তার কাছে সমার্থক শব্দ। অমানিশায় এখন সব কুয়াশাচ্ছন্ন। বাবা, মা, রেবা, আমন সবার থেকে সে দূরে বহুদূরে এসে পড়েছে। মুহুর্তেই একটা হাতের ধাক্কা এসে লাগলো, সঙ্গে বৃষ্টির ফোটা।
কি হলো তোর? ডাকছি শুনছিসনা? রতি তখনো ফ্যালফ্যাল করে আমনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তখন একেবারে ঝপ করে এক পশলা বৃষ্টি এসে ওদের দুজনকেই প্রায় ভিজিয়ে দিয়ে গেল। আমন হ্যাচকা টানে একটা টং দোকানের ভেতরে রতিকে নিয়ে ঢুকে গেল। রাত কত তাদের দুজনের কারো জানা নেই। শহরের রাস্তা প্রায় শুনশান, শুধু একটা দুটো এম্বুলেন্স ছুটে আসছে আর যাচ্ছে। রতি চোখ তুলে চারপাশটা দেখে নিল একবার। তারা এই মুহুর্তে মেডিকেলের সামনে ছোট এক টং দোকানে বসে আছে। প্লাস্টিকের পর্দা দেওয়া ঘেরা দোকানের ভেতরে বসে বৃষ্টির ছাট থেকে নিজেদের বাচিয়ে নিচ্ছে। একটা কুকুরও তাদের সাথে সাথে এসে আশ্রয় নিয়েছে। সোডিয়ামের বাতিতে বৃষ্টিকে মনে হচ্ছে হলুদ ফুল। মামা চা লন। চায়ের দোকানির আচমকা কথোপকথনে রাতের নীরবতা ভেঙ্গে গিয়ে দোকানীর মুখটা রতির কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠলো। কিছুটা আতকেও উঠলো সে। হুবহু তার বাবার চেহারা। কিন্তু বাবা তো বাড়িতে। বাবা এখন কি করছে? খবরের কাগজ ওল্টাচ্ছে না হয় টেলিভিশনের নিউজের সামনে মুখ গোমরা করে বসে আছে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে আমন বলে উঠলো, আজ বাড়ি ফিরে যাই। অনেক তো খুঁজলাম। না, রতির গলার স্বর দৃঢ় কঠিন আর রুক্ষ শোনালো। আমন আবার কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল এমন সময় হুড়মুড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজের ছাত্র আর কয়েকজন রিকশাওয়ালা টঙ এর ভেতরে ঢুকে পড়ল। মুহুর্তেই একটা ক্যাওয়াস তৈরি হয়ে অবশেষে যে যার আসন খুঁজে নিল। আবার সব চুপ। একদম চুপ। চায়ের কেটলির তলায় আগুন যেন দাউদাউ করে বেড়েই চলছে। আগুনে যেন সব্বাইকে পুড়িয়ে মারবে এমন ভাবে বেড়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দুটি পাশে ফিসিফিয়ে যাচ্ছে, ওদের মোবাইলের স্ক্রিনের আলোয় খানিকটা জায়গা আলোকিত।
- বেশ্যা মাগি একটা , শালা ৬০ টাকা নিয়েই ছাড়লো, বলেই মুখ থেকে একগাদা থুতু কুকুরটার গায়েই ফেললো।
- মাগী তখনো তো পা ফাঁক করে পড়ে ছিল আরো দু স্ট্রোক মেরে দিয়ে আসলিনা ক্যান? চায়ে চুমুক দিতে দিতে পাশের ছেলেটি বলে উঠলো।
রিকশাওয়ালা দুজনের সিগারেটের ধোয়ায় তখন টঙ দোকানটা ভরে উঠেছে।
- বেবুস্যে মাগীগুলানের রাত্তিরে বার হতি হবি কেন? লাং ধরতি বারোয়। নিজেই প্রশ্ন করে নিজেই উত্তর দেওয়ার তৃপ্তি নিয়ে সে চায়ে চুমুক দিল।
এই কিছুক্ষণ আগে একজন মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় হসপিটালে ফেলে গেছে কেঊ, মেবি রেইপড কেস, মেডিকেলের ছেলেটি মুখ খুললো এবার। রেবাও তো রাতে বের হয়েছিল, কোন এক রাতে, তার জন্যই বের হয়েছিল। তাহলে রেবাও কি বেশ্যা মাগি, বেবুস্যে খানকি হয়ে গেছে? হাসপাতালের ওই রক্তাক্ত মেয়েটি কি রেবা? নাকি সোহরাওয়ার্দির সেই ৬০টাকা নেওয়া বেশ্যা মাগী! রেবা কে? রতি এসব ভাবতে ভাবতে দোকান থেকে বেড়িয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালো। দোকানি পেছন থেকে চিৎকার করছে, এ মামা বিলডা দিয়ে যান। আমন যতক্ষনে বিল মিটিয়ে রতির পাশে এসে দাঁড়ালো ততক্ষণে বৃষ্টি তীব্র গতিতে ঝরে পড়ছে। রতি আর আমনের দু পায়ের ফাঁক গলে মিউনিসিপালিটির জল উপচে পড়ছে, রতি দেখছে তার জন্মের সময় মাতৃগর্ভ থেকে যে রক্ত বয়ে নিয়ে এসেছিল সেই রক্তের ধারা তার দু পায়ের ফাক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে। রতি হটাত করেই সেই পানির মধ্যে বসে পড়লো। আমন তাকে টেনে তুলতে পারছেনা বা রতি ওঠার জন্যও এতটুকু তাড়া অনুভব করছেনা। আমন এক পর্যায়ে হাল ছেড়ে দিয়ে রেগেমেগে চিৎকার করে উঠলো, রতি অনেক হয়েছে, আজ দুদিন হলো, আমরা খুঁজেছি সম্ভাব্য সব জায়গা, শহরের আনাচে কানাচে সব সব জায়গায়, পুলিশের কাছে গিয়েছি তারা ডায়রি পর্যন্ত নেয়নি, তোর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাডার ভাইদের কাছেও গেলাম তারা কি করলো? তারা মুতে দিল। তোর কথার উপরে জাস্ট মুতে দিল। এভাবে হয়না।
জোয়াল ভেঙে গেছে। গরুগুলো আর হালে দেওয়া যাচ্ছেনা। ওরা বুড়ো হয়ে গেছে, ওদের বদলের পালা এসেছে কিন্তু কে বদলাবে? চাষিটাই যে মারা যাচ্ছে, রতি প্রায় জোরে জোরে এসব বলতে থাকলো, বৃষ্টির তোড়ে তার সব কথা আমন অব্দি পৌছালনা। তুই এমনভাবে ভেঙে পড়িসনা। হতে পারে রেবা বাড়ি ফিরে গেছে। আমরা বাড়ি ফিরে দেখলাম রেবা তার ঘরে ঘুমুচ্ছে, আমন কথাগুলো যেন নিজেকেই শোনাচ্ছে।
রেবা বাড়ি ফিরে গেছে?
হ্যা, বাড়ি ফিরে গেছে।
বাড়িতো ফিরতেই পারে। যেমন করে সুখি ফিরে এসেছিল। ছোট বেলায় বাবার মুখে অনেকবার শুনেছে সে সুখি ফিরে আসার গল্প। সুখি ছিল ৬ কি ৭ বছরের। সারা বিকেল সে যখন মাঠে খেলে সন্ধ্যা পেরিয়েও ঘরে ফিরলোনা। সেদিন সারারাত এক বাড়ি লোক মিলে সুখিকে খুঁজেছিল, পুকুরে জাল পেতেছিল তাতেও সুখি ভেসে উঠলোনা, আশেপাশের গায়ের আত্মিয়দের বাড়িতে খোঁজ নেওয়া হয়েছিল। সেখানেও সুখি নেই। অবশেষে মসজিদের বড় হুজুরকে ডাকা হলো। উঠানে পাটি পেরে সারারাত কোরান তেলওয়াত চললো। হুজুর ধ্যান ভেঙে বললেন সুখিকে জ্বিনে নিয়ে গেছে। এখন শুধু আল্লায় পারে সুখিকে ফেরত দিতে। সব্বাইকে আল্লার উপরে ভরসা রাখতে বলে হুজুর আবার ধ্যানে বসলেন। সেদিন নাকি কোজাগরি পুর্নিমা ছিল। জ্যোৎস্নায় উঠোন ভেসে যাচ্ছিল। উঠোনে পাটি পেতে সবাই জড়ো হয়েছিল। আব্বার ফুফু সুখির মা তখন ঘরের দোরে বসেছিলেন নিথর নিশ্চুপ। উঠোনের কোণায় বড় ঝাকড়া বড়ই গাছটার মাথায় তখন কোজাগরি চাঁদের খেলা চলছে। ঝুপ করে কিছু একটা পড়ল। সুখির মা চোখ খুললেন। মা, মা ছোট্ট সুখির গলা পাওয়া গেল শেষরাতে। দৌড়ে গিয়ে সবাই বড়ই গাছের নিচে সুখিকে পড়ে থাকতে দেখলো। ঘরে নিয়ে আসা হলো সুখিকে। সুখীকে তখন শান্ত মৌন আর নিথর শাদা দেখাচ্ছিল, কেবল তার দু পায়ের ফাক গলে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। সেদিন হুজুরের শোকর গোজার করলো সবাই, সাথে আল্লার শোকর গোজার করতেও ভুললোনা। সুখিকে জ্বিনেরা অনেক মিষ্টি খাইয়েছে তাই সুখি এখন বিভোর ঘুমোচ্ছে।
রেবাও ফিরে আসবে সুখির মতো?
কে সুখি? আমনের প্রশ্ন।
রতি কোন উত্তর করলোনা কেবল আমনের দিকে একবার তাকালো। তারা দুজন হাঁটতে হাঁটতে তখন ঢাকা গেটের কাছে এসে পড়েছে। তখন শেষ রাতের চাদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে শহরের সবচেয়ে পুরাতন ইমারতের ভগ্নাংশ। গেটের পিলার ঘেষে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলোয় তার মুখটা আরো মায়াবিনী লাগছে। সে যেন দুই বাহু মেলে রতিকেই ডাকছে। রতি দৌড়ে তার কাছে গেল। রেবা! রেবা তুই এখানে! রেবা। মেয়েটিকে জাপটে জড়িয়ে ধরে রতি কাঁদতে লাগলো। মেয়েটি জোরে একটা ধাক্কা দিয়ে রতিকে রাস্তায় ফেলে দিল। আ মরণ, কোন ঘাটের মরারে, দিলো আমার সব কাপড় ভিজিয়ে দিলো! মেয়েটি রাগে গজগজ করছে আর কাপড় ঝেড়ে পানি ময়লা ফেলার চেষ্টা করছে।
আমন রতিকে ছো মেরে তুলে নিয়ে দ্রুত হাঁটতে লাগলো। রতি পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো তখনো সেই শেষ রাতের জ্যোৎস্নায় অদ্ভুত মায়াবিনী দু বাহু বাড়িয়ে তাকে ডেকে যাচ্ছে।
লাল ফ্রক ও রুপোলি মাছটা
বাইরে থেকে বাড়িটাকে রতির দূর্গ মনে হলো। বাড়িটার ভেতরের অন্ধকার চুম্বকের মতো রতিকে টানছে। সে টান যেন মাতৃগর্ভের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার টান। কিন্তু এতো ঘোর অন্ধকার। আমিতো ডুবে যাচ্ছি, রক্তে তলিয়ে যাচ্ছি, দাইমা আমাকে এখনই টেনে বার করো, আমি আর সহ্য করতে পারছিনা সে অন্ধকার। আমন রতির কাধে হাত রাখতেই রতি তার হাতটা চেপে ধরলো। তারা দুজন যখন বাড়ি ফিরলো বাবা তখনো টেলিভিশনের সামনে বসে আছে আর একের পর এক নিউজের চ্যনেল পালটে যাচ্ছে। বাবা একবার চোখ তুললেন কিছু বললেননা। আরেকটা চ্যানেল পালটালেন, আমনের দিকে একবার চোখ তুলে বললেন,
আমন! বাবা, আজ রাতে তুমি এ বাড়িতেই থেকে যাও।
আমন কিছু একটা বলতে যাবার আগেই বাবা হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকলেন। আমন গিয়ে বাবার পাশে একটা চেয়ার টেনে বসলো। রতি তখনো এক দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে।
- তোমার বাবাকে গিয়ে বলো, রেবা খুব ভালো মেয়ে।
আমন কোন কথা না বলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো জানালার বাইরে। আকাশে তখন মেঘ কেটে গেছে। চাদটাকে মেঘ আলতো করে জড়িয়ে রেখেছে যেন। বাড়িটা বেশ পুরোনো, কোথাও একটা তক্ষক ডেকে উঠলো। আমনের মনে হলো বাড়িটা যেন ইতিহাসের গহ্বর থেকে হা করে বেরিয়ে আছে।
- তোমার বাবাইতো চাকরির ব্যবস্থাটা করে দিয়েছিলেন। না হলে তো আমরা...
আমন রতির বাবার কথা শেষ করতে দিলনা, তার আগেই সে বলে উঠলো-
- বাবা তো আমেরিকা চলে যাচ্ছেন।
- ও......... বাবা বিরবিড় করে বলছেন, তাহলে রেবা......
আমন দেখছে পূর্ন চাদের আলোর নিয়ে রেবা গটগট করে হেঁটে চলে গেল তার সামনে দিয়ে। বয়সে রেবা দু কি তিন বছরের বড় হবে তবুও সে রেবা বলেই ডাকতো, তবে যেমন করে রতি ডাকতো তেমন করে নয়। রেবার সাথে সে বৃষ্টির পরে ফুলার রোড দিয়ে হেঁটেছে। বৃষ্টি ভেজা রাধাচূড়ার ফুল গুজে দিয়েছে তার চুলে। রেবা কখনো শুধু মিষ্টি হেসে অসভ্য বলেছে। আমনের মায়ের ঝুলন্ত মৃত শরীরটা রেবাই প্রথম আবিষ্কার করেছিল তাদের বাড়িতে। রেবা কি সেদিন আমাকে খুঁজতে গিয়েছিল? নাকি বাবাকে? তার উত্তর কেবল মা ই জানতেন। কিন্তু মা তো ঝুলে পড়লেন, মিলিয়ে গেলেন জ্যোৎস্নায়। আচ্ছা রেবাও কি মিলিয়ে গেছে জ্যোৎস্নায়? আমনের চোখ তখনো জানালা দিয়ে এমন কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে যা বোধহয় দূর অতীত হয়ে গেছে কিংবা এসবই হয়তো ভবিষতে ঘটবে। বাইরে আবার মেঘ ঘনিয়ে আসছে। হালকা মেঘগুলো এখন ঘনো হয়ে আসছে। চাঁদটাকে তারা এক্ষুনি গিলে খাবে।
- তোমার বাবা কথা দিয়েছিলেন............... রেবাকে নেবেন............ কিন্তু তোমার মা তো তার আগেই......... কিন্তু রেবার তো তোমাদের বাড়িতে যাওয়ার...............
ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে তীব্র গতিতে কিছু একটা ছুটে এসে দেয়াল ঘড়ির কাচটা চূর্ন বিচুর্ন করে দিল। এভাবে কি সময়ের গলা টিপে ধরা যায়? যায় না, তবুও রতি যেন প্রায় চিৎকার আর ধমকের সুরে বলে উঠলো,
- বাবা !
বাবা, আমন দুজনেই অন্ধকারেও রতির অস্তিত্ব খুঁজে নিল কিন্তু দেখলো অন্ধকার কোনটিতে রতি নেই কেবল দরজার পর্দা দুটো হালকা বাতাসে দুলছে। বাবা আমন দুজনেই তখন ভগ্ন সময়ের হাতে পড়ে নিস্তব্দধ হয়ে রইলেন। কেবল তারা দুজনে ভাঙা কাচের টুকরোগুলো এক জায়গায় জড়ো করার চেষ্টা করছেন অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে।
রতি মায়ের ঘরে একবার উঁকি দিয়ে দেখলো মা ঘুমুচ্ছে। মায়ের মুখটা একেবারে ছোট্টবেলার রেবার মতো মনে হচ্ছে। কেবল এই রেবার মুখে বয়সের বলি রেখার ছাপ, অর্ধ পাকা চুল আর এলোমেলো গোঙ্গানির আওয়াজ। রতি একবার মায়ের ঘরে ঢুকতে চাইলো কিন্তু কি ভেবে আবার চলে যেতে চাইলো। তারপর আবার সে পর্দা ঠেলে মায়ের ঘরে ঢুকতেই একটা পুরোনো ট্রাঙ্কে পা লেগে শব্দ করে উঠতেই মায়ের গোঙানিটা আরেকটু বেড়ে গেল। এরপর পা টিপে রতি বেরিয়ে আসতেই তার পায়ে কিছু একটা বাধলো। হাতে নিয়ে দেখলো ছোট একটা ফ্রক, লাল টুকটুকে একটা ফ্রক। রতি আরেকবার ঘুরে দাঁড়িয়ে মায়ের দিকে চোখ রাখলো, দেখলো অদ্ভূত হলুদ আলোতে মায়ের বিছানা ভেসে যাচ্ছে। মায়ের বুকের মধ্যে মুখ গুজে পড়ে আছে ছোট্ট রেবা। রেবার মুখে মায়ের একটা স্তন আর একটা স্তনের উপর রেবার ছোট্ট আঙুলের চিকন পাতলা আচড় কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
রতি অন্ধকার ভেদ করে দ্রুত গতিতে মায়ের রুম থেকে বেরিয়ে গেল। বসার ঘরে গিয়ে দেখলো তখনো আমন আর বাবা ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো জড়ো করে চলেছেন। রতি জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢাললো, ঢকঢক করে খেলো। বাবা বা আমন কেউই তার দিকে একবারের জন্যও তাকালেননা। রতি এবার শান্ত পায়ে তার ঘরের দিকে গেল। ঘরে ঢোকার আগে সে একবার রেবার ঘরে উঁকি দিল। ছোটবেলায় এটাই ছিল তাদের দুজনের ঘর। অনেকটা বয়স পর্যন্ত দুটিতে একসাথে ঘুমিয়েছে। রেবার কোলে মাথা রেখে ঘুমপাড়ানি গানও সে শুনেছে। রেবা তার দু কি তিন বছরের বড় হবে কিন্তু রেবাকেই সে সব থেকে বেশি মেরেছে। এখন এই খাটটিতে রেবা একলাই থাকে। তার জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করে দিয়েছে বাবা। রতি রেবার বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দিয়েছে। এ ঘরটায় আজ দুদিন হলো কেউ বাতি জ্বালায় না। কিন্তু জানালাটা খোলা ছিল। বাইরে থেকে একটা তির্যক আলো এসে ঘরের মধ্যে পড়েছে, বিশেষ করে বিছানাটা অনেক উজ্জ্বল হয়ে আছে। অন্ধকার। তার কি তীব্র শক্তি। সবথেকে বেশি বোধহয় অন্ধকারেই দেখা যায়। অন্ধকারেই দৃশ্যের সীমারেখা মুছে যায়। জন্ম নেয় নতুন দৃশ্যের। যা কিছু দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল তার ভেতরের সত্যের কতটুকু থাকে? দিন মানেই কি আলো? সত্য? সুন্দর? তাহলে রাত কি? অন্ধকার কি? মানুষের অসীম প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়ত মানুষের আর কোটি বছর লেগে যাবে কিংবা মানুষের ফসিল থেকে সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে উত্তর প্রজন্মের কোন এক মানুষ। যেমন করে উত্তর খুঁজে আমরা জেনে মানবের ইতিহাস, যেমন করে আমরা ঘোষনা করি হোমো স্যাপিয়েন্সের মহিমানিত্বের ইতিহাসের, যেমন করে পায়ের নিচে পিষে চটকে দিই ছোট্ট দূর্বা ঘাস। তীব্র আলো নাকি তীব্র অন্ধকার! কিছু বুঝে ওঠার আগেই রতির আঙুলগুলো স্পর্শ করলো নরম কোমল ছোট্ট কয়েকটি আঙুল। সে তীব্র আলো কি তিব্র অন্ধকার থেকে রতিকে টেনে নিয়ে এলো শুভ্রতার মাঝে। রতি দেখলো একটা ছোট্ট মেয়ে তার হাত ধরে আছে। রতির একবার মনে হলো আরে এইতো রেবা, আবার নিজের মনেই বললো রেবার তো এখন ত্রিশ। মেয়েটি তার হাত ধরে টেনে নিয়ে চললো। রতি কোন বাধা দিলোনা। মেয়েটির হাত ধরে সে একটা বিশাল হল ঘরে এসে পৌছালো। ঘরটা এত বড় আর তার সিলিং এতো উচু যে বাতাসের শব্দ দেয়ালগুলো ছুয়ে দিয়ে গমগম করছে। সে দেখতে পেল ঘরটির মাঝখানে বাবা মাথা নিচু করে বসে আছে, বাবার পাশেই আমন বসে আছে। কিছু দূরে একটা লাল শাড়ি পরিহিত নারী শুয়ে আছে আর মা সেই নারীর সামনে ঝুকে আছে। ঘরটি থেকে একটা সিড়ি উপড়ে উঠে গেছে সেই সিড়ির গোড়ায় বসে আছে আমনের মা। তিনি তার হাতের মধ্যে একটা শাড়ি গুটিয়ে নিচ্ছেন। সিড়ির পাশে রাখা কেবিনেটের উপর কনুয়ের ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমনের বাবা। কোটের হাতা টানটান করে নিয়ে টাই চেক করে নিচ্ছেন আবার তার চকচকে বুটের উপর ঝুকে দেখে নিচ্ছেন কালিটা ঠিক আছে কিনা। তিনি একনাগাড়ে পাইপ টানছেন আর কিছুক্ষণ পরপর তার হাত ঘড়িটায় সময় দেখছেন। ছোট্ট মেয়েটি রতির আঙুল ছেড়ে দিয়ে লাল শাড়ি পড়া নারীটির সামনে গিয়ে বসে পড়লো। রতিও তার পিছু নিল। রতি নারীটির সামনে এসে থমকে দাঁড়ালো। রতির একবার মনে হলো আরে এতো রেবা! আবার ভাবলো না এ রেবা নয়। কয়েকজন লোক এসে মেয়েটিকে সাদা কাপড়ে ঢেকে দিয়ে গেল। কারা তারা? তাদের কোনদিন দেখেনি রতি। তাহলে এ সত্যিই রেবা। রেবাকে লাল শাড়িতে কী সুন্দর দেখাচ্ছে। কিন্তু ও ঘুমোচ্ছে কেন? দুদিন তো ঘূমোয়নি মেয়েটা। রেবার পাশেই ছোট্ট একটা একুরিয়ামের জার যেটা রতিই কিনে দিয়েছিল আর তার সাথে একটা গোল্ডফিশ। জারটা ভেঙে পড়ে আছে আর মাছটা তখনো খাবি খাচ্ছে মেঝেতে। ছোট্ট মেয়েটি মাছটাকে যতবার ধরতে যাচ্ছে সেটা ততবার হাত ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই চলতে থাকলো অনন্তকাল বা মহাশুন্যের কোটি বছর কিন্তু লাল শাড়ি পরা সুন্দর রেবা যেন সে মহাশূন্যের কোটি বছরকে মিথ্যে করে দিয়ে উঠে বসলো আর খপ করে ধরে ফেললো গোল্ডফিশটিকে। সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট মেয়েটি খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। সে হাসিতে যেন এই বিশাল ঘরের জানালায় ঝড় উঠলো, জানালার কাঁচগুলো একে একে ভেঙে পরতে লাগলো। ছোট্ট মেয়েটির হাতে রেবা মাছটিকে দিল। এরপর তারা দুজনেই একে অন্যের হাত ধরে যখন ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালো তখন আকাশ ঘন নীল আর অসংখ্য নক্ষত্র মুড়িয়ে রেখেছে রাতের আকাশ, বাতাসের গতিবেগ একদম নেই, মনে হলো প্রচণ্ড শব্দ করে পৃথিবী যেন এই মাত্র নিজের পায়ে দাঁড়ালো।