Fiction

শ্বাপদতন্ত্র

Genre / Keywords Nature Writing
শ্বাপদতন্ত্র

এক!

ক্ষুধা! বয়স হয়ে গেছে তার, আগের মতো উদ্যম বা শক্তি নেই আর। নেই আগের সেই দুর্দমনীয় ক্ষমতা, গতিবিধির স্বাধীনতাও অনেকটাই খর্ব হয়েছে। এক কালের পরাশক্তি এখন পরিণত হয়েছে অতীত গৌরবের ছায়াতে। অক্ষমতার হাত ধরে সঙ্গে জুটেছে খাদ্যাভাব। আগের মতো সাবলীল ঢঙে শিকার করতে পারে না সে—আর তাই প্রায় সময়ই অভুক্ত থাকতে হয়। ফলস্বরূপ বুকে তার সব সময়ই দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে আগুন—তীব্র ক্ষুধার আগুন!

*****

বিশাল অরণ্যের কোল ঘেঁষে কেউ বহুকাল আগে পত্তন করেছিল এই বসতির। ক্রমে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে বিশাল এক জনপদ—তার করাল আগ্রাসনে বনভূমি আজ হুমকির মুখে। তবে হারানো দিনের মহিমা আজও কিছুটা অবশিষ্ট আছে প্রকৃতির।

বিশাল বিশাল মহীরুহ আর তার ছায়াতে বেড়ে ওঠা ঘন ঝোপঝাড়ে ছাওয়া গহীন বন এবং গ্রামের মাঝে রয়েছে দীর্ঘ এক চিলতে ঘেঁষো জমি। সেখানে চরে বেড়ায় গরু-মোষের পাল। স্থানীয় অনেকেরই জীবিকা নির্ভর করে এই চারণভূমির ওপর।

পশুপালন নির্ভর জনপদ, তাই বাঘ বা চিতাবাঘের কবলে গরু-মোষের মৃত্যু ঘটলে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায় পশুপালকের। এমনি একটা গরু অসুস্থ হলে আর কিছু না হোক, জবাই করে ওটার মাংস খাওয়া যায়—কাজে আসে চামড়াটাও। কিন্তু বাঘে নিলে লবডঙ্গা। তাছাড়া শুধু পশুই না, জানেরও তো ভয় আছে। যদিও মানুষখেকোর দেখা কদাচই মেলে কিন্তু তবু ঝুঁকি কম নয়।

হিংস্র শ্বাপদের কবল থেকে বাঁচার অভিপ্রায় থেকেই গবাদি-পশু চড়ানোর সময় প্রত্যেকে সাথে একটা শিঙ্গা রাখে। কেউ বিপদে পড়লে ওটা বাজিয়ে অন্যদের সংকেত দেয়া যায়—পর পর তিনবার শিঙ্গা ফুঁকলে সবাই বুঝে যাবে যে বাঘ এসেছে! ওটাই অত্র এলাকায় বিপদের সর্বোচ্চ সীমা।

চারণভূমিটা এমনিতে সমতল হলেও উত্তর ধারে একটা ছোট্ট টিলা মতো আছে, সেটা পেরিয়ে অন্যপাশে গেলে পাওয়া যাবে অর্ধবৃত্ত আকৃতির ঢালু একটা জমি—আকারে একর দশেকের মতো। চমৎকার ঘাস হলেও সাধারণত কেউ পশু চড়াতে যায় না ওদিকে। কারণ টিলার পেছনে পড়ায় গ্রাম থেকে একটু বেখাপ্পা রকমের আড়ালে জায়গাটা, তাছাড়া বড় বেশি বনের গা ঘেঁষা। যেকোনো সময় হিংস্র কোন শ্বাপদের আগমন ঘটার সম্ভাবনাটা বেশি ওদিকে।

হাঁটু সমান বয়স থেকেই গরু চড়ায় নুরু। এখন ও সদ্য কৈশোর পেরোনো তরুণ। চমৎকার স্বাস্থ্য আর সুদর্শন চেহারার সঙ্গে মানানসই অমায়িক ব্যবহারের কারণে গ্রামের ছেলে বুড়ো সবার প্রিয় পাত্র ও। তাছাড়া অল্প বয়সে এতিম হয়েছে বলে গ্রামের সবাই সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখে ওকে। অন্যসব দিনের মতো আজও গরু চড়াতে বেরিয়েছিল ও। দুপুরের পর হঠাৎ আবিষ্কার করল যে অন্যমনস্কভাবে ঘুরতে ঘুরতে ওর পালটা চলে এসেছে টিলার অন্যপাশের ঢালু জমিটাতে। প্রথমেই যে চিন্তাটা ওর মাথায় এলো তা হচ্ছে—এদিকে আসাটা কী ঠিক হলো, বিপদ-আপদ দেখা দিলে সাহায্য পেতে সমস্যা হবে। কিন্তু একটু পরেই চিন্তাটাকে ঝাটিয়ে বিদায় করে দিল ও মাথা থেকে। গত বেশ কয়েকমাসে একবারও হামলা চালায়নি বাঘ বা চিতাবাঘ জাতীয় কোন প্রাণী। গ্রামে দু’চার বার শিয়ালে মুরগী নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই খোয়া যায়নি। খামোখাই চিন্তা করে মরে বুড়োরা! মনে মনে পল্লী-সমাজের নীতি নির্ধারকদের প্রতি তাচ্ছিল্য মিশ্রিত বিরক্তি বোধ করল ও।

কেউ না আসায় এদিকের ঘাসগুলো ইচ্ছামতো বেড়ে উঠেছে, এই ঘাস পেলে অচিরেই হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠবে ওর পালটা। এখন থেকে এদিকেই আসতে হবে—ভাবল ও।

পশুগুলোকে ইচ্ছামতো চড়ে খেতে দিয়ে একটা মোটা গাছের গুঁড়িতে পিঠ ঠেকিয়ে বসল নুরু। কোমরে গোঁজা থলে থেকে তামাকের সরঞ্জাম বের করে বিড়ি বাঁধতে শুরু করল। গুনগুন করে একটা সুর ভাঁজছে মনের সুখে। ধূমপান আর আলস্য করে বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত করল ও। তারপর আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে দাঁড়াল। পশ্চিম আকাশ দেখে অনুমান করল আর দেড় কি দুই ঘণ্টা পর অস্ত যাবে সূর্য। মানে কিছুক্ষণের মধ্যেই গরু-মোষগুলো জড়ো করে ফিরতি পথ ধরা উচিৎ।

তামাকের সরঞ্জাম গুছিয়ে কোমরে গুঁজতে গিয়ে শিঙ্গাটাতে হাত ঠেকল ওর। এবং হুট করে মাথায় খেলে গেল একটা দুষ্টু বুদ্ধি। আচ্ছা, একটা মস্করা করলে কেমন হয়?

মাথায় চাপা দুর্বুদ্ধিটাকে মনে মনে উল্টে পাল্টে দেখল নুরু। যতই ভাবল, শয়তানিটা করার ইচ্ছা ততই চাগিয়ে উঠল ওর মনে। যেন ওর মাথার ভেতর বসে দুয়ো দিচ্ছে তৃতীয় কোন পক্ষ!

সব সময়ই দেখা যায় যে সুবুদ্ধি সহজে না আসলেও শয়তানি খুব দ্রুতই খেলে মানুষের মাথায়। বিশেষ করে অল্পবয়সীদের মাঝে মস্করা করার প্রবণতা প্রকট হয়ে থাকে। নুরুও তার ব্যতিক্রম নয় এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেল ওর। এমন তো না যে কারও ক্ষতি করতে যাচ্ছে—সামান্য একটু মজা করবে মাত্র! যেই ভাবা সেই কাজ—একটু আগে যে গাছটার গোড়ায় বসে ছিল সেটা বেয়েই বেশ কিছুটা উপরে উঠে গেল ও। মোটা একটা ডালে আয়েস করে পা ঝুলিয়ে বসে প্রস্তুত হয়ে নিল, তারপর গলায় ঝুলানো শিঙ্গাটা ঠোঁটে তুলে জোরে জোরে ফুঁ দিল তাতে—পর পর তিনবার!


দুই!

শিঙ্গার তীব্র, তীক্ষ্ণ আওয়াজ খানখান করে দিল শান্ত বিকেলের নীরবতা। এধরনের শিঙ্গা তৈরিই করা হয় বহুদূর থেকে সংকেত দেবার জন্য। তাই এর শব্দ যে জোরালো হবে সে তো জানা কথা। স্থানীয় লোকজন এই শব্দের সাথে সুপরিচিত—এবং এটা মোটেই তাদের প্রিয় কোন সুর না। বিপদ সংকেত পেলে কারও মন উৎফুল্ল হয় না—বরং শঙ্কাই জাগে। তার ওপর নুরু ফুঁ দিয়েছে তিনবার। এর অর্থ এলাকার সবাই জানে—মহা বিপদ সংকেত—বাঘ এসেছে!

বাঘ! হলুদের ওপর কালো ডোরাকাটা ভয়ঙ্কর সুন্দর ওই জানোয়ারটাকে সমীহ করে চলে সবাই, ভয়ও পায়। প্রকৃতিপ্রদত্ত অমিত শক্তির অধিকারী ওই শ্বাপদ আক্রমণ করলে প্রাণ নিয়ে ফেরা কঠিন। শিঙ্গাটা তিনবার বেজেছে—তার মানে হয় খুব কাছে-পিঠেই আগমন ঘটেছে বাঘের অথবা কপাল খারাপ হলে হয়ত গরুর পালে ঝাঁপিয়েই পড়েছে ওটা। ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ার চিন্তা বাদ কারণ তাহলে আর শিঙ্গা বাজানোর সুযোগ হতো না বাদকের।

সে যা-ই হোক, শব্দটা এসেছে টিলার অন্যপাশ থেকে। এদিকে যারা ওইদিন পশু চড়াচ্ছিল তাদের মাঝে একটা চাঞ্চল্য খেলে গেল। রাখালদের নেতা রহিম সরদার মোষ চড়ানোর পাশাপাশি লাঠি খেলাতেও পারদর্শী। বিশালদেহী, শক্তিশালী লোক সে। সাহসেরও কমতি নেই। প্রথমে সে-ই করিতকর্মা হলো। হাঁক ডাক করে নিমিষের মধ্যেই জনা বিশেক লোক জড়ো করে ফেলল রহিম। উত্তেজনায় বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছে, আর সমানে শাপশাপান্ত করছে। ‘ওই চুলোয় মরতে গেছে কোন ব্যাটা?’ মাটিতে পা দাপিয়ে জব্বার আলী নামের শুকনো মতো চেহারার এক বুড়োকে জিগ্যেস করল রহিম, ‘জানে না ওইদিকটা ভালা না! মামা ঘোরাফেরা করে ওইদিকে এইডা কি নতুন খবর?’ স্থানীয় ভাষায় বাঘকে ‘মামা’ নামেই ডাকে ওরা; ‘বাঘ’ শব্দটা পারতপক্ষে উচ্চারণ করতে চায় না।

পিচিক করে পানের পিক ফেলে মুখ বিকৃত করল জব্বার, ‘এহন কি আর ওইসব চিন্তা করনের সময় আছে? আগে চলো গিয়া দেইখা আসি অবস্থাডা কী?’

‘কইলেই কি যাওন যায়, মামা বইলা কথা!’ ভীতু প্রকৃতির হারুন মিয়া অন্যপাশ থেকে ফোঁড়ন কাটে।

‘মামা হইছে তো কী হইছে? আমরা এত্তগুলান লোক—হুদাই ভয় খাইস না!’ বলতে বলতে এক সাগরেদের কাছ থেকে লম্বা একটা বল্লম লুফে নেয় রহিম সরদার, ‘চল ভাইয়েরা, গিয়া দেখি কার কপাল পুড়ল!’

*****

ওদিকে গাছের ডালে আয়েস করে পা ঝুলিয়ে বসে ছিল নুরু। একটু আগে যে বিড়িগুলো বেঁধেছিল তারই একটা ধরিয়ে মনের সুখে টানতে টানতে নিজ মনেই হাসছিল। টিলার ঢাল বেয়ে শোরগোল করতে করতে নেমে আসা লোকজন দেখে গাছের গায়ে ঘষে বিড়িটা নিভিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলল ও—দলের মাঝে মুরুব্বি কিসিমের লোক থাকবেই। মস্করা করা এক জিনিস আর বেয়াদবি আরেক। তরতর করে গাছ থেকে নেমে দলটার দিকে এগিয়ে গেল ও।

দূর থেকে ওকে দেখে হেঁকে উঠল রহিম সর্দার, ‘ক্যাডারে? নুরা নাকি? ঠিক আছোস তুই?’

‘হ চাচা, ঠিকই আছি।’ একটু ইতস্তত করে উত্তরটা দিল নুরু, মনে মনে একটু ঘাবড়ে গেছে। রহিম সরদারকে দলের পুরোভাগে আশা করেনি ও, কারণ কয়েকদিন আগে শ্বশুর বাড়ি গিয়েছিল লোকটা— সে যে ফিরেছে তা নুরু জানত না। বদমেজাজি লোকটাকে একটু ভয়ই পায় ও। রহিম সরদার ভালর ভাল খারাপের যম। রেগে গেলে দু’চারটা চড়-থাপ্পড়ও দিয়ে বসতে পারে। ওর ওই লোকের পেল্লায় হাতের চড় খেলে আর দেখতে হবে না। একবার ওর ঝোঁক চাপল যে সত্যিই বাঘ এসেছিল দাবি করে বসে। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নাকচ করে দিল চিন্তাটা। অভিজ্ঞ লোক রহিম সরদার আর সঙ্গে জব্বার আলী বুড়োও আছে—বাঘের চিহ্ন খুঁজে না পেলে ও যে মিথ্যা বলছে তা ঠিকই বুঝে যাবে ওরা। আরও বেশি রেগে যাবে। তখন আর শুধু চড়-থাপ্পড় দিয়ে রেহাই দেবে না। কে জানে গ্রামে নিয়ে হয়ত সালিশই ডেকে বসবে!

বিষয়টা নিয়ে বেশি ভাবনা-চিন্তা করার সুযোগ মিলল না নুরুর। দ্রুতই ওর কাছাকাছি চলে এলো দলটা। ‘কী ব্যাপার নুরা? মামা আইছিল? কিছু নিছে নাকি?’ হাঁপাতে হাঁপাতে প্রশ্ন করল হারুন মিয়া। এই মুহূর্তে বাঘের মুখোমুখি হতে হবে না বুঝতে পেরে হম্বিতম্বি বেড়ে গেছে তার।

‘হ নুরু ভাই, কিছু খোয়া গেছে নি?’ ওর বছর দুয়েকের ছোট আউয়ালও কৌতূহল প্রকাশ করল।

রহিম সরদার অবশ্য প্রশ্ন করার ধার ধারছে না। দলের লোকজনকে নুরুর গরু-মোষগুলো জড়ো করতে বলল সে। গোটা বারো পশু চড়ায় নুরু—ও একাই ওগুলোকে সামলাতে পারে। এতোগুলো লোকের পক্ষে ওই ক’টা জন্তু পাকড়াও করা কোন কাজই না। তবু বাঘের উপস্থিতি বলে কথা।

‘আসলে কাকা,’ রহিমকে অন্যদিকে মন দিতে দেখে হালে পানি পেয়েছে নুরু, জব্বারকে উদ্দেশ করে বলল ও, ‘হইছে কী জানেন?...’

‘কী?’ বকের মতো গলা বাড়িয়ে ওর দিকে ঝুঁকে এলো বুড়ো। কৌতূহল তারও কম নেই।

‘আসলে...’ আমতা আমতা করতে লাগল নুরু, ঠিক কী বলবে সাজিয়ে নিতে চেষ্টা করছে।

‘ধুর মিয়া তাত্তারি কও তো, কোন দিকে গেছে মামাডা?’ পাশ থেকে একজন তাড়া লাগাল।

‘আসলে মামা আসেই নাইক্কা!’ হড়বড় করে বলে ফেলল নুরু।


তিন!

দিন তিনেক পরের কথা। মেজাজ খারাপ করে সেদিনের ওই গাছটা নিচে বসে আছে নুরু। আসলে গত তিন ধরেই মাথাটা গরম হয়ে আছে ওর। সামান্য একটা মজাও বুঝে না এই গাঁয়ের লোকগুলি। ছেলেবেলায় একবার দূরের এক গঞ্জে বেড়াতে গিয়েছিল নুরু। ওখানে দেখেছে যে মানুষ গাঁটের পয়সা খরচ করে ভাঁড়ামি দেখে। ঠকার জন্য ইচ্ছা করে টাকা ফেলে শহুরে বাবুরা! আর ওর নিজের গ্রামের গেঁয়ো ভুতের দল! একটু তামাশা করেছে বলে ওইদিন ওকে কান ধরে ওঠা-বসা করিয়েছে রহিম সরদার। বলেছে ফের এমন হলে মেরে হাড় গুড়ো করে দেবে! ব্যাটার যেমন মোষের মতো শরীর, মারলে হাড় গুড়ো হয়ে যাবারই কথা!

বেগতিক দেখে অবশ্য যুক্তি দিয়ে ব্যাটাদের বোঝাতে চেয়েছিল ও। কিন্তু সেকথাও কেউ কানে তোলেনি। তুলবেই বা কেন? কতক্ষণে সাহায্য আসে এটা যাচাই করার জন্য ‘বাঘ এসেছে’ এহেন মিথ্যা সংকেত দেবার যুক্তি ধোপে টেকার কথা না।

তবে ওর নামও নুরু! শোধ না নিয়ে ছাড়বে না। আর কিছু না হোক, ওই রহিম সরদার আর তার চেলাদেরকে বেগার খাটাবে ও। তার জন্য যদি নিজের বিপদ হয় তাও সই! অবশ্য ধরা না পড়লে আবার বিপদ কী! যেমন ভাবা তেমন কাজ। আজ আটঘাট বেঁধেই এসেছে ও। গরু-মোষ আনেনি আজ। আগের দিন ওগুলো এক বন্ধুকে বুঝিয়ে দিয়ে বলছে ও আজ দূরের এক গাঁয়ে বেড়াতে যাবে। তারপর ঘুর পথে এদিকে এসে ঘাপটি মেরে বসে আছে। উদ্দেশ্য আর কিছুই না। সন্ধ্যার আগে আগে শিঙ্গা ফুঁকে বাঘ আসার সংকেত দেবে ও। ওই সংকেত পেলে খোঁজ নিতে না এসে উপায় থাকবে না রহিম সরদারের। তবে এইবার আর দেখা দেবে না নুরু। গাছের মগ ডালে উঠে লুকিয়ে থাকবে। দেখবে, ব্যাটাদের নিষ্ফল ঘোরাঘুরি করে গলদঘর্ম হবার দৃশ্য। ওটাই হবে ওদের জন্য উচিৎ শিক্ষা!

যেমন ভাবা তেমন কাজ। গাছটার ওপরের দিকে ঘন পাতার আড়ালে নিজেকে ভাল মতো লুকিয়ে বসল নুরু। তারপর যথারীতি ফুঁকল শিঙ্গাটা—পর পর তিনবার!

*****

রহিম সরদার বা অন্য যারা মাঠে গরু চড়ায় তারা স্বপ্নেও ভাবেনি যে সেদিনের ঘটনার পর আবার কেউ এই বিষয় নিয়ে ফাজলামি করতে পারে। তাই শিঙ্গার আওয়াজ কানে যেতে সেটাকে স্বাভাবিক গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করল সবাই এবং লাঠিসোটা নিয়ে তেড়ে গেল শব্দ লক্ষ্য করে।

দলটা যখন হাঁপাতে হাঁপাতে টিলা পেরিয়ে নেমে এলো, পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন অস্ত যেতে বসেছে। কিন্তু কীসের কী! খাঁ খাঁ করছে গোটা তল্লাট। কোথাও কেউ নেই। থতমত খেয়ে গেল ওরা।

তবে কি কেউ ছিল, কিন্তু বাঘে ধরে নিয়ে গেছে বেচারাকে? ফিসফাস করে জল্পনা কল্পনা শুরু করল সবাই। বল্লমে ভর দিয়ে ভুরু কুঁচকে দাঁড়াল রহিম সর্দার। কী যেন ভাবছে।

‘কী চিন্তা করো, রহিম ভাই?’ জানতে চাইল দলের একজন।

‘শিঙ্গাডা বাজাইল কেডা?’ আপন মনে মাথা নাড়ল রহিম সরদার। তারপর সবাইকে বলল এলাকাটা তল্লাশি করার জন্য—বাঘের পায়ের ছাপ বা অন্য কোন চিহ্ন চোখে পড়ে কিনা দেখার জন্য।

‘ভালা কইরা দেখ ভাইয়েরা, মামায় নিয়া থাকলে রক্তের দাগ থাইকবো!’ সবাই যাতে শুনতে পায় তাই চেঁচিয়ে বলল জব্বার আলী।

গাছের ওপর থেকে ওদের কাণ্ড দেখে দাঁত কেলিয়ে হাসছে তখন নুরু। ও যতটা ভেবেছিল, বিষয়টাকে তারচেয়েও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে জনতা। দিবেই তো—তারা তো আর জানে না যে বাঘের আগমনের ব্যাপারটা ভুয়া। অবশ্য ওদের ছুটোছুটি করাটাই সারা হবে, কারণ বাস্তবে তো আর কোন বাঘ আসেনি!

‘এইবার মজা বুঝ!’ নিজের মনেই বিড়বিড় করল নুরু। ‘ওইদিন একটু মস্করা করছিলাম হেইডা ভাল্লাগে নাই, এখন?’ পুরো ব্যাপারটার সার্থকতা চিন্তা করে পারলে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দিত ও।

ওদিকে সবাই খোঁজাখুঁজিতে ব্যস্ত হলেও রহিম সরদার কিন্তু তাতে যোগ দেয়নি। সন্দেহ দানা বেঁধেছে তার মনে। এমনিতেই কেউ আসে না এদিকটাই—তাও ধরা যাক কেউ এসেছে কিন্তু তাহলে তার গরু-মোষ কোথায় গেল। রাখাল ছাড়া অন্য কারও তো শিঙ্গা নিয়ে চলা ফেরার করার কথা না। আর গরু চড়ানো ছাড়া অন্য কী কাজ থাকতে পারে এই বিজন জায়গাতে?

ওইদিন নুরুর ভাবগতিক ভাল ঠেকেনি তার, হয়ত আবার মস্করা করেছে ছোকরা—যদিও সেই সাহস ওর হবার কথা না, কিন্তু বলা যায় না। নুরু বা অন্য কেউ যদি শয়তানি করে ওই শিঙ্গা ফুঁকে থাকে তাহলে খুব সম্ভব এদিকেই কোথাও লুকিয়ে আছে সে। কারণ গাঁয়ে ফেরার পথে গেলে দলের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়ে যেত। আর এই ভর সন্ধ্যা বেলা বনের মধ্যে দিয়ে ঘুর পথে বাড়ি ফেরাটা যে কারও পক্ষেই অস্বাভাবিক। এদিকে যদি কেউ লুকিয়েই থাকে তাহলে তার জন্য আদর্শ জায়গা হচ্ছে ওই বড় ঝাঁকড়া গাছটা। সাত-পাঁচ ভেবে সিদ্ধান্ত নিল রহিম সরদার। যেই ভাবা সেই কাজ, বল্লমটা মাটিতে গেড়ে গাছ বেয়ে ওঠা শুরু করল সে।

এদিকে এমন কিছু ঘটতে পারে সেটা হিসাব করেনি নুরু। ও ভেবেছিল—কাউকে না দেখে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ গজ গজ করে বিদায় নেবে দলটা। তার বদলে এমন আতিপাতি করে পুরো এলাকা খুঁজে দেখবে, এমনকি গাছেও চড়বে—তাও আবার রহিম সরদার স্বয়ং—এমনটা ওর মাথায় খেলেনি। নুরু যতটুকু চিনত তাতে করে ভেবেছিল পেশী সর্বস্ব বোকা কিসিমের লোক রহিম সরদার—কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বাস্তবে ঘটে যথেষ্ট বুদ্ধি ধরে লোকটা।

আর লুকিয়ে থেকে লাভ নেই বুঝতে পেরে পাতার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো ও। মনে মনে নিজেকেই গাল দিচ্ছে—উচিৎ ছিল শিঙ্গাটা বাজিয়েই ঘুর পথে চম্পট দেয়া—তাহলে আর এই বিপদে পড়তে হতো না।

গতবারের সাক্ষাতে যেখানে ছিল উদ্বেগ এবার সেখানে জায়গা করে নিল রাগ। নুরুকে দেখেই গলার রগ ফুলিয়ে চেঁচিয়ে সবাইকে ডাকল রহিম সরদার। ওরা দু’জনে গাছ থেকে নামার আগেই নিচে জড়ো হলো সবাই। হতাশ চোখে লক্ষ্য করল নুরু—একটা মুখও বন্ধুভাবাপন্ন নয়। মনে মনে আবার নিজের বোকামির জন্য শাপশাপান্ত করল ও।

এদিকে রাগে ফেটে পড়েছে উপস্থিত জনতা। এই মিথ্যা সংকেত দেয়াটা কী ধরনের ফাজলামি সেই কৈফিয়ত চাইছে সবাই। নুরু মাটিতে স্থির হয়ে দাঁড়াতেই ওর গালে কষে এক চড় বসিয়ে দিল রহিম সরদার। নুরুর মনে হলো মুগুর দিয়ে বাড়ি মারা হয়েছে ওকে। ব্যথার চোটে চোখের কোণ দিয়ে পানি বেরিয়ে এলো ওর—অনুভব করল ফেটে গেছে ঠোঁটের একপাশ।

তবু ওর কপাল ভালই বলতে হবে। ওই একটা চড়ই যা—এরপর আর কেউ ওর গায়ে হাত তুলল না। তবে তাই বলে ভর্ৎসনা করার বেলায় কেউ কারও চেয়ে কম গেল না। বিষয়টা নিয়ে শীঘ্রই সালিশ বসবে গাঁয়ে—এই মর্মে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে দল বেঁধে বিদায় নিল সবাই। ততক্ষণে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে তবু একবারের জন্যও নুরুকে সঙ্গে যেতে বলল না কেউ।

স্তব্ধ হয়ে বনের প্রান্তে একা দাঁড়িয়ে রইল নুরু। চড় খেয়ে ব্যথায় মুখের বাম পাশ টনটন করছে ওর, কিন্তু মনের মাঝে যে জ্বলুনি হচ্ছে তার তুলনায় ওটা কিছুই না। নিজের দোষটা সহজে চোখে পড়ে না মানুষের, কথাটা নুরুর বেলাতেও সত্যি। ওর সঙ্গে কী করা হয়েছে সেটাই নজর কাড়ছে ওর—কিন্তু নিজে কী করেছে সেটা বেমালুম ভুলে গেছে। আরও বেশ কিছুক্ষণ পর ও যখন গায়ের পথ ধরল ততক্ষণে আকাশের কোণে দেখা দিয়েছে চাঁদ, তার ম্লান আলোয় পথ চলতে চলতে জেদের সঙ্গে ভাবল নুরু যে এখানেই শেষ নয়! আরও নিখুঁত কায়দা করে কাজ সারবে ও পরের বার। খাটিয়ে রহিম সরদারের হাড় কালো না করলে ওর শান্তি হবে না! কিন্তু এই সব ভাবতে ভাবতে পথ চলার সময় ও ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করল না যে অদূরেই বনের প্রান্তে ঝোপের মধ্যে থেকে ওর ওপর নজর রাখছে জ্বলজ্বলে একজোড়া চোখ—প্রচণ্ড ক্ষুধা সেই চোখের মালিকের পেটে!


চার!

দুইদিন পরের কথা। আগামীকাল নুরুর বিচারের জন্য সালিশ বসবে। এর আগেই ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলতে হবে ওকে। যদিও এবার আর ধরা পড়ার ঝুঁকি নেবে না। কিন্তু তবু—কোন কারণে যদি আবার ধরা পড়েও যায়, সালিশের আগে হলেই ভাল সেটা। কারণ একবার রায় দিয়ে দিলে এটা গোটা গ্রামের মাথা ব্যথা হয়ে যাবে। এখন ওর এই ‘বাঘ এসেছে! বাঘ এসেছে!’ খেলার কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে উত্তম-মধ্যম দেয়ার থেকে বেশি আর কিছু করতে পারবে না রহিম সরদার বা তার দলের লোকেরা, কিন্তু সালিশের কথা ভিন্ন। তাই যা করার আগেই করে নিতে চাইছে নুরু। হয়ত এবারেও ধরা পড়ে গেলে শাস্তি কিছু বাড়বে কিন্তু এমন কোন ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না। এতো কিছু ভাবতে পারল অথচ ওই হঠকারী কাজটা করা থেকে বিরত থাকার চিন্তা একবারও এলো না ওর মাথায়। সত্যিই মানুষের মতিগতি বোঝা দায়!

আজও সন্ধ্যার কিছু আগে সেই গাছের নিচে এসে দাঁড়াল নুরু। ‘দেখি আজ কে আমাকে ধরে! যত্তসব বেরসিকের দল!’ বিড়বিড় করে কথা ক’টা আউড়ে, অভ্যস্ত ভঙ্গিতে শিঙ্গা ফুঁকল ও। তারপর ঘুরেই দ্রুত পা চালাল বনের দিকে। উদ্দেশ্য কেউ আসার আগেই বনে ঢুকে যাবে। তাহলে আর ধরা পড়ার ঝুঁকি থাকবে না। খুঁজতে এসে খামোখাই হয়রান হবে রহিম সরদার আর তার চেলারা। কাজের কাজ কিছুই হবে না। তারা সন্দেহ করতে পারলেও প্রমাণ করতে পারবে না, তাছাড়া ওর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ নতুন করে তেমন কিছু যোগও করবে না। বিচারে তেমন কিছুই হবে না ওর। কারণ এই ঘটনার আগ পর্যন্ত গ্রামে বেশ একটা সুনাম ছিল নুরুর, তার ওপর এতিম বলে এমনিতেই মানুষের সহানুভূতি আছে ওর ওপর। হয়ত মোরল নিজে ওকে শাসিয়ে দেবে বা বড়জোর কিছু জরিমানা করা হবে। তা হোক গে। কিন্তু রহিম সর্দার আর তার দলের লোকদের তো বেগার খাটিয়ে মারা যাবে!

বনের সীমানার কাছে পৌঁছে একবার ফিরে দাঁড়িয়ে পেছন পানে চাইল নুরু। নাহ, এখনও কারও টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য যাবার কথাও না। লোকজন জড়ো হয়ে আসতে যতটা সময় লাগে ততক্ষণ পার হয়নি এখনও। তবে আর বেশি দেরী করাটাও ঠিক হবে না। ভেবে যেই আবার বনের দিকে ঘুরেছে ওমনি জায়গায় বরফের মতো জমে গেল নুরু। অস্ফুট একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এলো ওর গলা চিরে। ভয়ে, বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেছে মুখটা।

গজ পঞ্চাশেক সামনে একটা ঝোপ চোখে পড়ছে। সেই ঝোপের ভেতর থেকে ধীর গতিতে বেরিয়ে আসছে কী ওটা? ‘মামা!’ মৃদু কণ্ঠে উচ্চারণ করল নুরু। সমস্ত শরীর যেন জমে গেছে ওর।

বিশালদেহী হলদে জানোয়ারটা পুরোপুরি বেরিয়ে এলো ঝোপ ছেড়ে। শেষ বিকেলের রক্তিম আলোয় অদ্ভুত সুন্দর দেখাছে ওটার ডোরাকাটা দেহটাকে। উজ্জ্বল হলুদাভ চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে নুরুর ওপর। সন্তর্পণে ওর দিকে এক পা এগোল ওটা। তারপর আরেক পা।

নুরুর পায়ে যেন শেকড় গজিয়েছে! চেষ্টা করেও নড়তে পারছে না ও। বনের ধারে বসবাস করলেও আগে কখনও এই রকম সামনাসামনি বাঘ দেখেনি ও। বাঘে খেয়ে যাওয়া গরু দেখেছে কয়েকবার। পায়ের ছাপও চোখে পড়েছে। গঞ্জে গিয়ে একবার সার্কাসের খাঁচায় বন্দি বাঘও দেখেছিল—কিন্তু বনের বাঘের সামনে এই প্রথম। কিংকর্তব্য স্থির করতে পারছে না নুরু। এমন সময় হঠাৎ গলায় ঝুলানো শিঙ্গাটা হাতে ঠেকল ওর। তাই তো! একটু আগেই তো তিনবার ফুঁকেছে ওটা। এতক্ষণে তো চলে আসার কথা রহিম সরদার আর তার দলবলের। একটু আগেই যাদের কাছ থেকে পালাতে যাচ্ছিল, এই মুহূর্তে সেই তাদেরই আগমনের জন্য কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা শুরু করল ও। আর কতক্ষণ লাগবে ওদের পৌঁছতে? আবার শিঙ্গা ফুঁকে দেখবে নাকি, যদি তাহলে তাড়াতাড়ি আসে?

বাঘটা এখনও স্থির দাঁড়িয়ে আছে। কেন যে ওটা সময় নিচ্ছে তা নুরু জানে না, কিন্তু দেরী করছে বলে মনে কিছুটা আশা জাগছে ওর। হয়ত সময় মতো এসে পড়বে রহিম সরদার আর তার দল। খুব ধীরে ধীরে শিঙ্গাটাকে আবার মুখের কাছে তুলল ও। মুহূর্তের ভগ্নাংশের জন্যেও বাঘটার ওপর থেকে চোখ সরাচ্ছে না।

*****

পরপর তিনবার শিঙ্গা বাজার মানে বাঘ এসেছে। এই তল্লাটে এটা এক অলিখিত নিয়ম। কিন্তু গত কয়েকদিনে নিয়মের ব্যতিচার কম হয়নি। তাই এবারও যখন টিলার অপর পাশ থেকে বেজে উঠল শিঙ্গা, দেখতে যাবার কোন দরকার নেই বলে সিদ্ধান্ত দিল রহিম সরদার। ‘ওই নুরু ছ্যামড়ার কাম এইডা!’ জোর গলায় ঘোষণা করল সে। ‘হালার বাইচলামি কাইলকা সালিশের সময় বাইর করুম! তোমাগো ওই দিক কান দেওনের কাম নাই!’ বিরক্তির সঙ্গে এক দলা থুথু ফেলে মতামতের জন্য সবার দিকে তাকাল সে। উপস্থিত সবাই সমর্থন জানাল তার এই সিদ্ধান্তকে।

কিছুক্ষণ পর একই দিক থেকে আবারও শোনা গেল শিঙ্গার শব্দ—তবে এবারে মাত্র একবার।

‘ওই দেখ, আমরা কেউ যাই নাই দেইখা হালায় আবার বাজাইতেছে! বদমাইশ জানি কোনেকার!’ মুখ খিঁচিয়ে গাল দিল সাদেক নামের একজন।

‘কান দিস না, হালায় পাগল!’ অন্য একজনের সংক্ষিপ্ত জবাব।

যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল রাখালেরা—সন্ধ্যায় সব গরু-মোষ জড়ো করে গুনতে হয়, তারপর বাড়ি ফেরার পালা। সেদিকে মন দিল সবাই।

*****

শিঙ্গার শব্দ কানে যেতেই ভয়ানক বেগে নুরুর দিকে ধেয়ে এলো বাঘটা। আঁতকে উঠে প্রাণপণে উল্টো দিকে ছুট দিল নুরু। শিঙ্গায় দ্বিতীয় ফুঁ দেবার আর সুযোগ পেল না।

কথায় আছে জানের মায়া বড় মায়া। এমনিতেই বেশ ভাল দৌড়াতে পারে ও, তার ওপর এখন ভয় আর জীবনের প্রতি টান বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে ওর গতি। কিন্তু তবু, বাঘের সঙ্গে দৌড়ের পাল্লায় মানুষের কোন আশা থাকে না—ওর বেলাতেও তার ব্যতিক্রম হলো না। ক্রমশ কমে আসতে লাগল দুইয়ের মাঝের দূরত্ব।

বাঘটা যখন আর মাত্র গজ দশেক পেছনে রয়েছে—আর দুই লাফেই ওর নাগাল পেয়ে যাবে—তখন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা এর মতো ঘাসের সঙ্গে পা জড়িয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল নুরু। আগের গতিবেগের কারণে বেশ কিছুদূর পিছলে গেল ওর দেহটা। হাচরে পাচরে ওঠার চেষ্টা করল ও, কিন্তু পারল না। বেকায়দায় পড়ে বাজেভাবে মচকে ওর ডান পা। কিন্তু এতক্ষণে তো বাঘটার ওর ওপরে এসে পড়ার কথা!

শরীর মুচড়ে বহু কষ্টে চিত হলো নুরু—এবং মুখোমুখি হলো এমন একটা দৃশ্যের যার কোন ব্যাখ্যা দাঁড়া করানো শুধু ওর কেন, যে কারও পক্ষেই অসম্ভব।



পাঁচ!

ক্ষুধা! ইদানীং ক্ষুধার জ্বালায় বড্ড কষ্ট হয় মনসা তান্ত্রিকের। ব্রত গ্রহণের ফলে এবং নিজের অলৌকিক শক্তি ধরে রাখার জন্য একমাত্র মাংসাশী জন্তুর কলজে ছাড়া আর কিছু খাওয়া সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ তার জন্য। কিন্তু মাংসাশী জীব টাকায় ষোলোটা মেলে না! এটা ঠিক যে সাধারণ মানুষের তুলনায় তার চাহিদা বহুগুণে কম। সাধনা করে অল্প খাদ্যে জীবনধারণের ক্ষমতা অর্জন করেছে সে। কিন্তু তবু কমেরও তো একটা সীমা আছে! আগে, বয়সকালে দেহে শক্তি ছিল অফুরান, এখন বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তন্ত্রমন্ত্রের শক্তি বৃদ্ধি পেলেও দৈহিক শক্তি কমে গেছে তার। আর আপন আহার যোগাড়ের পথে সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধান অন্তরায়।

আগে বাঘ বা চিতাবাঘ শিকার করা তার কাছে কোন ঘটনাই ছিল না। বনে ঢুকে খুঁজে বের করাই যা কঠিন, তারপর মেরে নিলেই হলো। কিন্তু এখন আর ওই ভয়াবহ জীবগুলোর সাথে হাতাহাতি লড়াই করার ভরসা পায় না। শক্তি আর ক্ষিপ্রতা কমে গেছে, শিকার করতে গিয়ে নিজেকেই হয়ত শিকারে পরিণত হতে হবে! তাই ইদানীং ছোটখাটো জীব-জানোয়ার—যেমন শিয়াল, খাটাস অথবা পাখি—যেমন চিল, শকুন, এমনকি ঠেকায় পড়লে কুকুর, বিড়াল বা কাকের কলজে পর্যন্ত খেতে হয় তাকে। এই লজ্জা সে কোথায় রাখবে? আর ওই সব পুঁচকে প্রাণীর কলজেতে না আছে স্বাদ আর না ভরে পেট! তবু, বাঁচতে তো হবে।

আসলে সমস্যাটা পাকিয়েছে বনের এক উপদেবতা। বছর দুই আগে তার পেয়ারের একটা বাঘিনীকে মেরে আয়েস করে ওটার কলজে খাচ্ছিল মনসা তান্ত্রিক। সে কি আর ছাই জানত ওটা উপদেবতার প্রিয় জানোয়ার? রেগে গিয়ে তাকে অভিশাপ দিয়েছে ওই দেবতা। বনের মধ্যে এখন আর ওই জাদুশক্তি কাজ করে না। আর তাই হাতাহাতি করতে হয় হিংস্র শ্বাপদের সঙ্গে!

কতদিন হয়ে গেল পেট পুরে খায় না সে! শুকিয়ে প্যাকাটি মেরে গেছে একদা হৃষ্টপুষ্ট দেহটা! ক্ষুধা, বড্ড ক্ষুধা।

ওইদিন নুরু ছেলেটার কীর্তি দেখে হঠাৎই একটা চিন্তা মাথায় এসেছে মনসা তান্ত্রিকের। এদিকের বনের ধারে একটা বাঘ থাকে—বেশ বড় একটা মদ্দা বাঘ। ওটার কলজেটা নিশ্চয়ই বিরাট হবে আকারে। ভাবলেই জিভে পানি এসে যায়! কিন্তু বনে ঢুকে ওটাকে মারার মুরোদ নেই মনসার। তবে কোনভাবে ওটাকে বন থেকে বের করে আনতে পারলে হয়। একবার জাদুশক্তি ব্যবহার করতে পারলে তাকে আর পায় কে? নুরু এদিকে ঘোরাফেরা করে, বাঘটা যদি ওকে শিকার করতে ঘন বন ছেড়ে বেড়িয়ে আসে তাহলেই হবে। কেল্লা ফতে!

কপালটা ভালই বলতে হবে মনসার—এই বাঘটা খুব সম্ভব আগেও মানুষ শিকার করেছে। ওটার হাবভাবে মানুষের প্রতি পশুদের সহজাত যে ভয় তার নজির দেখেনি মনসা তান্ত্রিক। অন্যদিকে নুরু ছোকরা সেদিন খামখা শিঙ্গা বাজিয়ে নিজের একমাত্র রক্ষাকবচ হারিয়েছে।

এই শিঙ্গা নিয়েও চিন্তিত ছিল মনসা—সে জানে যে ওটা বাজালেই এসে ভিড় জমাবে রাজ্যের লোকজন। তখন আর কিছুই পরিকল্পনা মাফিক সারা যাবে না। কিন্তু এখন আটঘাট বাঁধা আছে—প্রথম দিন শিঙ্গা বাজিয়ে মস্করা করার পর কাজটা অব্যাহত রাখার জন্য নিজের অশুভ ক্ষমতা খাটিয়ে বারবার নুরুকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্ররোচিত করেছে মনসা তান্ত্রিক। আর তাই অবচেতন মনের তাগিদে নুরুও চালিয়ে গেছে ওই হঠকারিতা—ফলে এবারে আর ওর শিঙ্গার আওয়াজ শুনে কেউ বাঁচাতে আসবে না।

*****

বাঘটা খুব সম্ভব ঝাঁপ দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, এমন সময় পেছন থেকে আক্রান্ত হয়েছে ওটা। আধশোয়া অবস্থায়, বিস্ফারিত চোখে, পায়ের অসহিষ্ণু ব্যথা ভুলে নুরু দেখল যে বাঘটার পিঠের ওপর লেপটে আছে মানুষ সদৃশ একটা জীব।

অশুভ কী যেন একটা আছে ওটার মাঝে। কঙ্কালসার শুকনো ওটার দেহ—সন্ধ্যার ম্লান আলোতেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে চামড়ার নিচ থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসা হাড়ের সমষ্টি। চার হাত-পায়ে তীক্ষ্ণ নখ রয়েছে ওটার আর সেই নখের সাহায্যের আঁকড়ে আছে বাঘটার পিঠে। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, বাঘটা এই অযাচিত সওয়ারকে তাড়ানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করছে না। কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে বিশাল, ভয়াবহ ওই জন্তুটা; ক্রমশ ঘোলাটে হয়ে আসছে ওটার জ্বলজ্বলে হলদে চোখ দুটো।

হিশ্! হিশ্! করে জান্তব একটা ধ্বনি বের হচ্ছে বাঘের পিঠের ওই বীভৎস সওয়ারটার মুখ থেকে। টপ টপ করে ঝড়ে পড়ছে লালা—দেখা যাচ্ছে টকটকে লাল এবং অস্বাভাবিক লম্বা একটা জিভ! কাঁচাপাকা, জট পড়া লম্বা চুল তার বাতাসে উড়ছে। নখগুলি যেখানে আঁকড়ে আছে বাঘের শরীর, সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে মিশে যাচ্ছে কালো, ঘন ধোঁয়ার মতো কী যেন! চামড়া ভেদ করে বাঘটার শরীরেও ঢুকছে ওই জিনিস! তার প্রভাবেই কিনা কে জানে, দেখতে দেখতে একেবারেই নিভে গেল বাঘটার চোখের জ্যোতি। ভারসাম্য হারিয়ে ঘাসের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে গেল ওটা।

কয়েক মুহূর্ত পর উঠে দাঁড়াল বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে থাকা সেই বিভীষিকাময় জিনিসটা। হ্যাঁ, মানুষই ওটা—আবার মানুষ নয়! ওটার দিকে তাকিয়ে একটু আগে বাঘের কবলে পড়ার চেয়েও অনেক বেশি অসহায় বোধ করল নুরু। আধবসা অবস্থায় কাঁপা কাঁপা হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল গলা থেকে বুকের ওপর ঝুলতে থাকা শিঙ্গাটা—কেউ এখনও আসছে না কেন? উত্তরটা জানা থাকলেও ওর উত্তপ্ত, ভীত মস্তিষ্ক বিষয়টা অস্বীকার করে আশাটাকে আঁকড়ে ধরতে চাইল—ঠিক যেভাবে খড় কুটো ধরে বাঁচতে চায় ডুবন্ত মানুষ!

*****

ঠোঁট চাটল মনসা তান্ত্রিক—ল্যাঠা চুকে গেছে! বিরাট এক বাঘ মেরেছে সে—আজ অনেকদিন পর পেট ভরে খাওয়া যাবে। খাবার নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না আগামী বেশ কিছুদিন। তবে একটা কাজ বাকি আছে। উপদেবতার মন পাওয়ার জন্য তুলা রাশির জাতকের একটা খুলি দরকার তার—লোকালয়ে হানা দিয়ে মানুষ শিকার করাটাকে নীতিগত ভাবে ঘৃণা করে বলে এতো দিনেও যোগার হয়নি জিনিসটা। গোটা দুই ডাকাত আর এক ভবঘুরে অবশ্য তার কবলে পড়েছিল কিন্তু তাদের কারওই রাশি ঠিক ছিল না। এই ছেলে কী রাশি কে জানে। একটাই উপায় আছে—দেবতার কাছে নৈবেদ্য দিতে হবে এর খুলিটা! সে অভিশাপ তুলে নিলে বুঝবে রাশি ঠিক ছিল। কোমর থেকে ভোজালিটা টেনে নিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেল সে নুরুর ভূপতিত দেহটা লক্ষ্য করে।

*****

বাড়ি ফেরার পথে রহিম সরদার আর তার দলের লোকেরা শুনল, বহুদূরে বেজে চলেছে শিঙ্গা—একবার, দু’বার, তিনবার, চারবার...


– সমাপ্ত –




— End —