বাংলাদেশের মঞ্চে ‘রক্তকরবী’: বহুমাত্রিক অভিযাত্রার সাহসী উচ্চারণ
একটি নাটক শতবর্ষ অতিক্রম করার পরও যখন ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক সংকট ও শিল্পভাবনার মধ্যে উত্তরোত্তর প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে তখন তাকে কালোত্তীর্ণ না বলে পারা যায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী সেই বিরল কালোত্তীর্ণ নাটকগুলোর একটি, যা কেবল বাংলা নাট্যসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গত এক শতাব্দী ধরে মানুষের স্বাধীনতা, প্রেম, প্রতিবাদ এবং সর্বপরি মানবমুক্তির ভাষ্য হয়ে উঠেছে। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হলেও রক্তকরবী কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নাটক নয়। বিগত এক শতাব্দিতে ঘটে যাওয়া শিল্পবিপ্লব, যান্ত্রিক সভ্যতার উত্থান, ঔপনিবেশিক শোষণ, স্বৈরতন্ত্র, পুঁজিবাদ কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতার নির্মমতাসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটেরই এক জীবন্ত দলিল।
রক্তকরবী রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘদিনের নাট্যচিন্তা এবং অভিনয় আকাক্সক্ষার এক অনন্য সমন্বয়। নাটকটির জন্মের পেছনেও রয়েছে তাঁর দীর্ঘপ্রয়াস। ১৩৩০ সালের ভাদ্র থেকে ১৩৩১—এর আশ্বিনের মধ্যে নাটকটির একাধিক খসড়া তৈরি হয়। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশের আগেও রবীন্দ্রনাথ বারবার নাটকটির পাঠ ও চরিত্রে পরিবর্তন এনেছেন। এমনকি মুদ্রণকালেও কিছু সংলাপ ও অংশে সংশোধনের চিহ্ন পাওয়া যায়। প্রথমদিকে নাটকটির নাম ছিল ‘যক্ষপুরী’। পরে নাম বদলে হয় ‘নন্দিনী’ বা ‘নন্দিনীর পালা’ এবং শেষ পর্যন্ত স্থির হয় রক্তকরবীতে।
শুধু নাটকের নাম নয়, চরিত্রের নামেও রবীন্দ্রনাথ বদল এনেছিলেন একাধিকবার। কেন্দ্রীয় চরিত্র নন্দিনীর প্রথমদিকের নাম ছিল—‘খঞ্জনী’; পরে ‘সুনন্দা’, এবং শেষ পর্যন্ত ‘নন্দিনী’। এমনকি ‘কিশোর’ চরিত্রটি নাটকের প্রথমদিকের খসড়ায় ছিলোই না। ‘প্রবাসী’তে প্রকাশের আগে দশম খসড়ায় রবীন্দ্রনাথ এই চরিত্রটি যুক্ত করেন।
রক্তকরবী প্রকাশের আগেই রবীন্দ্রনাথ নাটকটির অভিনয়ের কথা ভাবতে শুরু করেছিলেন। নাটকটি তিনি নিজে মঞ্চে দেখতে চেয়েছিলেন, এমনকি অভিনয় করার আগ্রহও ছিলো তাঁর। সে লক্ষ্যে মহড়াও শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু নন্দিনী চরিত্রের নির্ধারিত অভিনেত্রী রেবা রায় অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। তবে নন্দিনী চরিত্রটি শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রত্যাশামতো মঞ্চে রূপ পাবে কিনা, তা নিয়ে মনে সংশয় ছিল। কারণ যে চরিত্রকে তিনি নিজেই নির্মাণ করেছেন, সেই চরিত্রের বাস্তব অভিনয়—রূপ খুঁজে না পাওয়ার আক্ষেপ তাঁর ছিল।
যাই হোক, রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় রক্তকরবী মঞ্চে আসে ‘দ্য ট্যাগোর ড্রামাটিক গ্রুপ’—এর উদ্যোগে। প্রমথনাথ ঠাকুরের প্রযোজনায়, বিহার ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যার্থে কলকাতার নাট্যনিকেতনে ৬ এপ্রিল ১৯৩৪ সালে নাটকটির প্রথম অভিনয় হয়। বিজ্ঞাপনে জানানো হয়েছিল, প্রদর্শনীর সমস্ত আয় ভূমিকম্প—ত্রাণ তহবিলে দেওয়া হবে এবং প্রদর্শনীতে কবি স্বয়ং উপস্থিত থাকবেন। কিন্তু প্রথম অভিনয় দেখে রবীন্দ্রনাথ পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। রক্তকরবী যে ধরনের গভীরতা, প্রতীকী শক্তি এবং অন্তর্গত অনুভব দাবি করে, তা মঞ্চে কতটা ধরা সম্ভব—এই প্রশ্ন নাটকটির প্রদর্শনী দেখার পর তাঁকে আরো বেশি ভাবিয়েছে। কারণ রক্তকরবীর নাট্যশক্তি কেবল সংলাপ, ঘটনা বা চরিত্রে সীমাবদ্ধ নয়; তার ভিতরে রয়েছে একটি সম্পূর্ণ প্রতীকী জগৎ। যক্ষপুরীর অন্ধকার, রাজশক্তির অদৃশ্য উপস্থিতি, শ্রম ও সম্পদের সম্পর্ক, মানুষের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা এবং তার বিপরীতে নন্দিনীর প্রাণময় উপস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে রক্তকরবী এটি এমন এক নাট্যভাষা তৈরি করে, যার মঞ্চরূপ সহজে ধরা দেয় না।
তবু নাটকটি নিয়ে রবীন্দ্রনাথের আকাক্সক্ষা থেমে থাকেনি। জীবনের শেষ পর্বে এসেও তিনি নাটকটির অভিনয়ের কথা ভাবছিলেন। নিজের নাটকগুলোর মধ্যে রক্তকরবী তাঁর কাছে বিশেষ একটি জায়গা দখল করে ছিল। কিন্তু তাঁর নিজের কল্পনার নন্দিনীকে তিনি যেন শেষ পর্যন্ত মঞ্চে খুঁজে পাননি। ফলে রক্তকরবীকে রবীন্দ্রনাথের অপূর্ণ আকাক্সক্ষার এক বিশেষ প্রতীক হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।
২.
রবীন্দ্রত্তোর যুগে রক্তকরবীর প্রথম সফল মঞ্চায়ন ঘটে ১৯৫৪ সালে শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায় কলকাতার নাটকের দল ‘বহুরূপী’র মাধ্যমে। তার ঠিক ৩ বছর পরে ১৯৫৭ সালে বাংলাদেশের মঞ্চে রক্তকরবীর প্রথম অভিনয় হয়। বাংলাদেশে রক্তকরবীর ইতিহাস কেবল একটি নাটকের মঞ্চায়নের ইতিহাস নয়, এটি একটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নির্মাণের সহায়ক উপাদানও বটে। যে ভূখণ্ডে একসময় রবীন্দ্রনাথকে ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণ পরিমাপে বিচার করার চেষ্টা হয়েছে, তাঁর গান নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তাঁর সাহিত্যকে রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক নীতির সঙ্গে অসঙ্গত বলে প্রচার করা হয়েছে—সেই ভূখণ্ডেই রক্তকরবী বারবার মঞ্চায়িত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আবেদনে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ পূর্ববঙ্গের সাংস্কৃতিক জীবনকে গভীরভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা, জনবিন্যাসের ব্যাপক পরিবর্তন এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্তের দেশত্যাগের ফলে সংস্কৃতিচর্চার দীর্ঘদিনের যে পরম্পরা ছিল, তা কার্যত ভেঙে পড়ে। বিশেষত মঞ্চনাটকের ক্ষেত্রে এই শূন্যতা ছিল প্রকট। কেননা মুসলিম সমাজে নাট্যচর্চা তখনও ব্যাপক সামাজিক স্বীকৃতি অর্জন করতে পারেনি। ফলে পূর্ববঙ্গের নাট্যজগৎকে নতুন করে নিজস্ব ভিত্তি নির্মাণ করতে প্রয়াসী হতে হয়।
ইতিহাসের নিয়ম হলো—সংকটের মধ্যেই নতুন সাংস্কৃতিক শক্তির জন্ম হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববঙ্গে ধীরে ধীরে একটি নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটে। এই শ্রেণির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে ওঠে সংস্কৃতিচর্চা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সংস্কৃতিচর্চা পরবর্তীকালে সমগ্র পূর্ববাংলার নাট্যআন্দোলনের ভিত নির্মাণ করে। একই সময়ে জেলা ও মফস্বল শহরগুলোতেও নাট্যচর্চা চলছিল, যদিও সেসব মূলত ঐতিহাসিক বা মুসলিম ঐতিহ্যনির্ভর নাটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বিপরীতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজধানীকেন্দ্রিক নাট্যচর্চা আধুনিক বাংলা নাটকের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নাট্যচর্চার মাধ্যমেই পূর্ববঙ্গে রক্তকরবীর মঞ্চযাত্রা শুরু হয়। ১৯৫৭ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ছাত্রী হল কর্মপরিষদ’—এর উদ্যোগে প্রথমবারের মতো পূর্ববঙ্গে মঞ্চস্থ হয় রক্তকরবী। নির্দেশনা দেন অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিম। মাত্র এক বছরের মধ্যেই ১৯৫৮ সালে নাট্যসংগঠন ‘ড্রামা সার্কেল’ নাটকটির আরেকটি প্রযোজনা মঞ্চে আনে। নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করেন মকসুদুস সালেহীন। এই দুটি মঞ্চায়ন ছিল পূর্ববঙ্গের আধুনিক নাট্যচিন্তার এক সাহসী সূচনা। কেননা, রক্তকরবী কোনো সহজ নাটক নয়। এর ভাষা কাব্যিক, চরিত্র প্রতীকধর্মী, নাট্যসংঘাত বহুমাত্রিক। এই নাটক মঞ্চে আনতে শুধু অভিনয় দক্ষতা নয়, প্রয়োজন ছিল দার্শনিক বোধ, নন্দনতাত্ত্বিক প্রস্তুতি এবং সাহসী নির্দেশনার। সেই অর্থে ১৯৫৭ ও ১৯৫৮ সালের এই দুটি মঞ্চায়ন ছিল পূর্ববাংলার নাট্যচর্চার পরিণত মানসিকতারও পরিচায়ক।
গত শতাব্দির ষাটের দশক পূর্ববাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক অস্থির সময়। ১৯৬১ সালে সমগ্র ভারতবর্ষে পালিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এই উদ্যাপনের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে। কিন্তু পূর্ববাংলার সংস্কৃতিনিবিষ্ট সমাজ তা উপেক্ষা করেনি। এই সময় ’ড্রামা সার্কেল’ পরপর কয়েকটি রবীন্দ্রনাটক মঞ্চস্থ করে। সেগুলোর মধ্যে রাজা ও রাণী, তাসের দেশ এবং রক্তকরবী অন্যতম। বজলুল করীম ও মকসুদ সালেহীনের যৌথ নির্দেশনায় মঞ্চস্থ রক্তকরবী সে সময় নাট্যাঙ্গনে উল্লেখযোগ্য আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই সময়ে রক্তকরবীর এই প্রযোজনার তাৎপর্য ছিলো ব্যাপক। এর কিছুদিনের মধ্যেই পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্র রবীন্দ্রনাথকে পরিকল্পিতভাবে সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৬৫ সালের পাক—ভারত যুদ্ধের পর রেডিওতে রবীন্দ্রসঙ্গীত স¤প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৯৬৭ সালে জাতীয় পরিষদে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে পাকিস্তানি আদর্শবিরোধী বলে আখ্যায়িত করা হয়। এরপর থেকে রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে রবীন্দ্রসাহিত্যকেও সন্দেহের চোখে দেখার একপ্রকার পরিবেশ তৈরির প্রয়াস নেয়া হয়।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান যখন রবীন্দ্রনাথকে সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে নির্বাসিত করতে চাইছিল, তখন ইতিহাস যেন উল্টো পথেই চলল। রাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা যত কঠোর হতে থাকলো, রবীন্দ্রনাথও তত দ্রুত পরিণত হতে থাকলেন বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীকে। এই রূপান্তরের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ ১৯৬৯—এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রক্তকরবীর ঐতিহাসিক মঞ্চায়ন। ১৯৬৯ সালের আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল না; এটি ছিল সাংস্কৃতিক মুক্তিরও আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার তখন জাতীয়তাবাদের নতুন ভিত নির্মাণ করছে। এই সময় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদ’ সিদ্ধান্ত নেয় রক্তকরবী মঞ্চস্থ করার। সেই সময়ে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয়া ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, যে রাষ্ট্র রবীন্দ্রসঙ্গীতকে নিষিদ্ধ করেছে, সেই রাষ্ট্রের একেবারে কেন্দ্রভূমিতেই রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে প্রতীকী রাজনৈতিক নাটক মঞ্চে আনার প্রস্তুতি চলছিল। সৈয়দ হাসান ইমামের নির্দেশনায় যখন নাটকের মহড়া শুরু হয় তখন একদিকে ছাত্র আন্দোলন, অন্যদিকে পুলিশের নজরদারি। এই টালমাটাল সময়ে কখনও বুয়েটের স্টাফ কোয়ার্টারে ড. ইনামুল হকের বাসায়, কখনও পাক—সোভিয়েত মৈত্রী সমিতির কার্যালয়ে মহড়া চলে। এই নাটকের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের অনেকেই পরে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তন্মধ্যে মতিউর রহমান, মাহফুজ আনাম, আসাদুজ্জামান নূর, ড. ইনামুল হক, মফিদুল হক, মালেকা বেগম, আবুল হাসনাত প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
অবশেষে ১৯৭০ সালের ৩ জানুয়ারি বাংলা একাডেমির মাঠে নির্মিত অস্থায়ী মঞ্চে অভিনীত হয় রক্তকরবী। উপস্থিত ছিলেন দশ হাজারেরও বেশি দর্শক। তৎকালীন সময়ের বিচারে যা অভাবনীয়। বাংলাদেশের আধুনিক নাট্য—ইতিহাসে এই প্রযোজনাকে একটি মাইলফলক বলা যায়। পাকিস্তানি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক নীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষের সামনে রবীন্দ্রনাথের নাটক মঞ্চস্থ করা ছিল এক ধরনের নীরব রাজনৈতিক উচ্চারণ। সেখানে যক্ষপুরী যেন পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থারই প্রতীক হয়ে উঠেছিলো। রক্তকরবীর সংখ্যায় পরিচিত চরিত্রেরা যেন পূর্ববাংলার নিপীড়িত জনতা; আর নন্দিনীর আহ্বান যেন স্বাধীনতার অনিবার্য ডাক।
এই প্রযোজনায় গোলাম মোস্তফা অভিনয় করেন রাজা চরিত্রে, আবুল হায়াত অধ্যাপক, আসাদুজ্জামান নূর কিশোর, কাজী তামান্না নন্দিনী, লায়লা হাসান চন্দ্রা এবং ইনামুল হক গেঁাসাই চরিত্রে অভিনয় করেন। চলচ্চিত্র অভিনেতা আনোয়ার হোসেনকেও প্রথমদিকে রাজা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ভাবা হয়েছিল; কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত অংশ নিতে পারেননি।
৩.
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে রবীন্দ্রনাথ নতুন মর্যাদায় ফিরে আসেন। যে রবীন্দ্রনাথকে পাকিস্তান আমলে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথের রচিত গানকে গ্রহণ করা হয় বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পরপরই বাংলাদেশে থিয়েটার চর্চা শুরু হয়। এবং সেই চর্চা প্রবল জোয়ার পায় গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান গঠনের মধ্য দিয়ে। নাটকের দলগুলি রবীন্দ্রনাথের নাটক ও রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য থেকে নাটক করলেও স্বাধীন বাংলাদেশে রক্তকরবীর মঞ্চায়ন করতে বেশ সময় চলে যায়। এর একটি কারণ হতে পারে নাটকটি মঞ্চায়নের চ্যালেঞ্জ। যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও তাঁর জীবদ্দশায় হয়েছিলেন। নাটকটির ভাষা, ছন্দ, চরিত্র, সংগীত ও মঞ্চনির্মাণ—সবকিছুই বিশেষ প্রস্তুতি দাবি করে। ফলে রক্তকরবী মঞ্চে আনা মানেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা।
তবু সময়ে সময়ে বাংলাদেশের নাট্যদলগুলো এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। ১৯৭৩ সালে মুস্তাফা মনোয়ারের পরিচালনায় রক্তকরবী বাংলাদেশ টেলিভিশনে নাট্যরূপ পায়। অনেক নাট্যবোদ্ধার মতে, এটি বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় প্রযোজনা।
১৯৭৪ সালে বাংলা সাধারণ রঙ্গমঞ্চের দ্বিশতবার্ষিকী উপলক্ষে চট্টগ্রামে মঞ্চস্থ হয় রক্তকরবী। নির্দেশনায় ছিলেন কামাল এ. খান। এরপর ১৯৭৮ সালে নান্দনিক নাট্য সম্প্রদায় (ঢাকা নান্দনিক) মঞ্চস্থ করে রক্তকরবী। নির্দেশনা দেন সুশান্ত সাহা।
রবীন্দ্রনাটক মঞ্চায়নের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নাট্যসংগঠন হিসেবে স্বীকৃত চট্টগ্রামের তির্যক নাট্যদল। এই দলটি ১৯৯৬ সালে আহমেদ ইকবাল হায়দারের নির্দেশনায় রক্তকরবী মঞ্চে আনে। এ পর্যন্ত নাটকটির ১৫৫টি প্রদর্শনী মঞ্চস্থ হয়েছে।
২০০১ সালে আতাউর রহমানের নির্দেশনায় নাগরিক নাট্যস¤প্রদায় রক্তকরবী মঞ্চস্থ করলে নাটকটি আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। মূলত নাগরিক প্রযোজিত রক্তকরবীকেই স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যমত সফল মঞ্চ প্রযোজনা হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশের থিয়েটারের যুবরাজ খ্যাত খালেদ খান ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী অপি করিমের অভিনয় আজো দর্শক আনন্দচিত্তে স্মরণ করে। এই প্রযোজনায় নাটকটি নতুন শতকের দর্শকের সামনে ফিরে আসে আরও পরিশীলিত মঞ্চ—নির্মাণ, অভিনয়—ভাষা এবং প্রতীকী উপস্থাপনার মাধ্যমে। যদিও নাটকটি নির্মানকালে অভিনেতা—অভিনেত্রী নির্বাচনে দলের অভ্যন্তরে বেশ বিতর্ক সৃষ্টি হয় তবুও সেই বিতর্ক নাটকটির শিল্পমূল্যকে ছাপিয়ে যায়নি। বরং নাগরিকের প্রযোজনা নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে রক্তকরবীকে পুনরায় আলোচনায় নিয়ে আসে। নাটকটিতে আতাউর রহমান, খালেদ খান, গাজী রাকায়েত, লুৎফর রহমান জর্জ, শামীম শাহেদ, শিরিন বকুল, অনন্ত হিরা, অপি করিম প্রমুখ অভিনয় করেন।
নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের রক্তকরবী প্রযোজনার কুশিলব অনন্ত হিরা ও আরেক নাগরিক সদস্য নূনা আফরোজ মিলে ২০০৩ সালে গঠন করেন নাটকের দল ‘প্রাঙ্গনে মোর’। তারাও ২০০৮ সালে মঞ্চে আনে রক্তকরবী। নাটকটি নির্দেশনা দেন নূনা আফরোজ। সেই সাথে তিনি নন্দিনীর ভূমিকায় অভিনয়ও করেন।
বাংলাদেশের থিয়েটার দলগুলোর স্কুলিং প্রোগ্রামের প্রযোজনা হিসেবেও রক্তকরবী মঞ্চস্থ হয়েছে। ১৯৯০ সালে থিয়েটার স্কুলের প্রথম ব্যাচের সমাপনী প্রযোজনা হিসেবে রক্তকরবী মঞ্চায়িত হয়। নাটকটির নির্দেশক হিসেবে ছিলেন ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়। ২০১০ সালে চট্টগ্রামের ফেইম স্কুল অব ড্রামাও রক্তকরবী মঞ্চস্থ করে। নির্দেশক হিসেবে ছিলেন অসীম দাস। এছাড়া ২০২৪ সালে প্রাচ্যনাট স্কুল অব অ্যাক্টিং অ্যান্ড ডিজাইনের সমাপনী প্রযোজনা হিসেবে শওকত হোসেন সজীবের নির্দেশনায় রক্তকরবী মঞ্চস্থ হয়।
সা¤প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক নাট্যচর্চায়ও রক্তকরবী নতুনভাবে ফিরে এসেছে। ২০২৩ সালে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় সিনে অ্যান্ড ড্রামা ক্লাব তানভীর নাহিদ খানের নির্দেশনায় নাটকটি মঞ্চস্থ করে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগও তানভীর নাহিদ খানের নির্দেশনায় রক্তকরবী মঞ্চে আনে। একই বছর ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)—এর বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রযোজনা হিসেবে মঞ্চায়িত হয় রক্তকরবী। নাটকটি নির্দেশনা দেন দিদার মুহাম্মদ। সর্বশেষ ২০২৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক প্রযোজনা হিসেবে রক্তকরবী মঞ্চায়নের দুটি তথ্য পাওয়া যায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ নাটকটি মঞ্চস্থ করে রেজা আরিফের নির্দেশনায় এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ড্রামা এন্ড থিয়েটার ফোরাম মঞ্চস্থ করে শ্রেয়সী সরকারে নির্দেশনায়।
৪.
বাংলাদেশে রক্তকরবীর মঞ্চায়নের এসকল ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, একই নাটক মঞ্চায়নে প্রতিটি সময়েই তার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা উপস্থিত হয়েছে। এটাই সম্ভবত রক্তকরবীর সবচেয়ে বড় শক্তি। ১৯৫৭ সালে যখন প্রথম রক্তকরবী পূর্ববঙ্গের মঞ্চে আসে, তখন তার প্রধান তাৎপর্য ছিল আধুনিক বাংলা নাট্যচর্চার বিকাশ। ১৯৬১ সালে একই নাটক হয়ে ওঠে রবীন্দ্রবিরোধী রাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক সাহসের প্রতীক। আবার ১৯৭০ সালে নাটকটি হয়ে ওঠে গণঅভ্যূত্থানের সাহসী রাজনৈতিক উচ্চারণ। যেখানে যক্ষপুরীকে দর্শক দেখেছিলো পাকিস্তানি শাসনের রূপক হিসেবে। স্বাধীনতার পর নাটকটি ধীরে ধীরে আরেকটি পরিসরে প্রবেশ করে। সেখানেও নাটকটি মানুষের অস্তিত্ব, রাষ্ট্র ও ব্যক্তি, প্রকৃতি ও যন্ত্রসভ্যতার দ্বন্দ্ব, পুঁজিবাদের নির্মমতা এবং স্বাধীনতার অন্তর্গত অর্থ নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করতে শুরু করে।
রক্তকরবী নাটকে নন্দিনী প্রকৃতি, সৌন্দর্য, প্রেম, স্বাধীনতা এবং মানুষের আত্মমুক্তির সম্মিলিত প্রতীক। যক্ষপুরীর সমস্ত নিয়ম, ভয়, শৃঙ্খল এবং সঞ্চয়ের বিরুদ্ধে তিনি জীবনের পক্ষ নিয়ে দাঁড়ান। বাংলাদেশের বিভিন্ন নির্দেশক নন্দিনীকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা ও উপস্থাপন করেছেন। কোথাও তিনি প্রেমের প্রতীক, কোথাও বিদ্রোহের, কোথাও মানবিকতার, আবার কোথাও প্রকৃতির প্রতিনিধি। এ কারণেই বাংলাদেশের দর্শক প্রতিটি সময়ে নন্দিনীকে নতুন করে গ্রহণ করেছে।
রক্তকরবীতে রবীন্দ্রনাথ কখনো যক্ষপুরীর ভৌগোলিক পরিচয় দেননি। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই তাকে সময় ও স্থানের বাইরে রেখেছেন। যাতে প্রতিটি যুগ নিজের যক্ষপুরী নিজেই তৈরি করে নিতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সেরকম ঘটেছেও। স্বাধীনতার পূর্বে পাকিস্তান আমলে যক্ষপুরী ছিল রাষ্ট্রক্ষমতায় স্বৈরাচারের প্রতীক। আবার স্বাধীনতার পরে অনেক নির্দেশক সেখানে দেখিয়েছেন আমলাতন্ত্র, পুঁজিবাদ, ভোগবাদ কিংবা যান্ত্রিক সভ্যতার অমানবিক রূপ। অদম্য মুনাফালোভ, পরিবেশ ধ্বংস, প্রযুক্তিনির্ভর বিচ্ছিন্নতা, মানুষের পরিবর্তে সংখ্যার গুরুত্ব—এসবই যেন এই সময়ের যক্ষপুরীর লক্ষণ।
রক্তকরবীর এই বহুমুখী ধারাবাহিক রূপান্তরই নাটকটিকে কালজয়ী করে তুলেছে। এটাই রক্তকরবীর সবচেয়ে বড় বিজয়। যতদিন মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখবে, যতদিন অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো হাতে দাঁড়াবে, যতদিন ক্ষমতার বিপরীতে একজন নন্দিনী লাল রক্তকরবী ফুল হাতে মানুষের কাছে ফিরে আসবে; ততদিন বাংলাদেশের মঞ্চেও রক্তকরবী অভিনীত হবে নানারূপে, নানা ব্যখ্যায়। রক্তকরবীর শতবর্ষ পূর্তিতে এটাই প্রত্যাশা।
About the Author
Apu Mehedi