অকথন
"ব্যাগ গুছাইসো?"
"না গোছানোর কী আছে? "
আমি চুপ হয়ে গেলাম। জয়ো এভাবে কথা বলছে কেন! সেই কাল থেকেই গলার স্বর কেমন ঠান্ডা, মুখেও প্রচ্ছন্ন থমথমে ভাব। কেউ কি কিছু বলেছে ওকে? নাকি আমিই কিছু করেছি! অবশ্য ওর রাগ এমনিতেই বেশি। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে হুট করে মুখ ভার করে ফেলে, বাচ্চাদের মতো বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মানাতে হয়। কী অদ্ভুত বলেন, ছেলেমেয়ে পালা ঝামেলা দেখে আমি সারা জীবন সন্তান শূন্য সংসার কল্পনা করেছি, আর এখন নিজের বউই বাচ্চামো করে! তাতে যদিও আমার তেমন একটা বিরক্ত লাগে না, বরং 'কেউ আমার ওপর অভিমান করেছে এবং আমি তার অভিমান ভাঙাতে পারছি' এই উপলব্ধিগুলো নিজের কাছে বেশ ভালোই লাগে। পুরো ব্যাপারটায় আলাদা একট সুখ আছে।
"চলো বাইরে থেকে ঘুইরা আসি। "
জয়োর মুখ আরও থমথমে হয়ে গেলো নাকি আমিই ভুল দেখলাম, কী জানি! আমি সামান্য অসহায়াভাব গলায় ফুটিয়ে বললাম, " কালকে সকালে তো চলেই যাইতেসি। চলো না..."
ও বিছানার একপাশে পা তুলে বসে পড়লো। কোনও কথা বলল না। আমি ছোট্ট করে একটা শ্বাস ছাড়লাম। মৃদু গলায় বললাম, " কী হইসে তোমার? কেউ কিছু বলসে? মন খারাপ কেন তোমার? "
জয়ো আমার কথা শুনতে পেয়েছে বলে মনে হলো না। আমার চেয়ে নিজের পায়ের আঙ্গুলের নখের দিকে মনোযোগ বেশি ওর। এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওগুলোর দিকে। ভেতরে ভেতরে আমি একটু একটু বিরক্তি অনুভব করা শুরু করছি, টের পেলাম। কতক্ষণই আর সাধা যায়! তাছাড়া এসেছি বন্ধুদের মাঝে, ওকে তো সাথে আনার কথাই ছিলো না। আতিফ বাদে অন্য কোনো বন্ধু বউ আনেও নি। প্রায়োরিটি, গুরুত্ব কি সব সময় সমানভাবে দেয়া যায়? বোকা মেয়ে এই ব্যাপারটা বুঝতেই চায় না!
কিছুটা বিরক্তি নিয়েই আমি বলে উঠলাম, " আচ্ছা থাকো তাহলে। আমি যাই, ওরা উঠোনে বসছে। আসতে চাইলে আইসা পইড়ো, লজ্জা কইরো না। "
জয়ো ঝট করে আমার দিকে তাকালো। আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। ও খাট থেকে নামতে নামতে বলল, " না থাক, চলো আমিও যাবো তোমার সাথে। "
আমি হেসে ফেললাম শব্দ করে। জয়ো এসে আমার মাথায় এত জোরে চাটি মারলো যে এক নিমিষে আমার মুখ বন্ধ হয়ে গেলো। তাতে হাসি অবশ্য থামলো না, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে জায়গা নিয়ে ঠিকই ঝুলে রইলো।
২
রাতটা শীতের রাত না, কিন্তু তবুও উঠোনের মাঝখানে আগুন জ্বালানো হয়েছে। আমরা বন্ধুরা সেটাকে ঘিরে বসে বড় একটা বৃত্ত তৈরি করেছি। জাইফের কোলে গিটার। আসাদের হাতে মাউথ অরগান। চিন্ময়ীর কাছে একটা বেহালাও দেখেছিলাম। সেটা অবশ্য এখন এই আসরে দেখা যাচ্ছে না।
নেলি গান গাওয়ার জন্য গলা ঠিক করছে। আর রিফু অনবরত কথা বলে যাচ্ছে। বাকিরা কেউ ওদের দিকে তাকিয়ে আছে, কেউ দুপাশের বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে চাপা গলায় কথা বলছে। বলতে বলতেই হাহা করে হেসে উঠছে। আমার হঠাৎ মনে মনে কেমন একটু আফসোসই অনুভূত হলো। জয়োকে না আনলেই বোধহয় ভালো হত। হাজার হোক, বউয়ের সামনে তো আর সবকিছু বলা যায় না বন্ধু-বান্ধবীদের। আর, আমি যদি বলে ফেলিও, ওরা তো আমার বউয়ের সামনে সেসব নিয়ে আলাপ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে না। সব সম্পর্কের একটা আলাদা সুর থাকে। বউ পাশে রেখে কি আর বন্ধুত্বের সুরে তাল মেলানো যায়?
আমি আড়চোখে জয়োর দিকে তাকালাম। আমার পায়ের উপর হাত রেখে কাত হয়ে বসে আছে। মাথার চুলগুলো বেণি করা। কতবার বললাম ওকে, বেণি করো না। ওভাবে তোমাকে ভালো লাগে না। কই আর শুনলো!
নেলি গান শুরু করবে মনে হচ্ছে। তিশিও এখন আগুনের কাছাকাছি চলে এসেছে। ও-ও গাইবে মনে হচ্ছে।
" রুদ্র? "
আমি জয়োর দিকে তাকিয়ে জবাব দিলাম, " হু? "
ও মৃদু গলায় বলে উঠলো, " ঐ মেয়েটা কে? "
" কোনটা? "
" ঐ যে হলুদ শাড়ি পরে আছে যে..."
" ও? ও হচ্ছে তিশি। প্রথম দিন পরিচয় করায় দিসিলাম তো তোমাদের। "
" দিসিলা? "
আমি চোখ ছোটছোট করে আস্তে করে মাথা দোলালাম।
জয়ো সম্ভবত আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো, নেলি গান শুরু করে দেয়ায় চুপ করে গেলো। গিটার বাজাচ্ছে জাইফ। মাউথ অরগান মুখে নিয়ে আসাদ বসে আছে। আর একটু সময় গেলে পরে বোধহয় বাজাতে শুরু করবে। তিশিও মৃদু মৃদু হাত নাড়ছে। এই মেয়েটাকে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে জরা এখন পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারে নি। এখনও একদম সেই ইন্টারে পরা সময়ের মতোই আছে! একটুও বদলায় নি। একদম একটুও না!
তিশি একসময় গান শুরু করলো। ওর গানের গলা অস্বাভাবিক রকমের ভালো। গানের সাথে সাথে মনে হয় মায়া ঝরে পড়ছে গলা থেকে। আমাদের পুরোদল এক নিমিষে চুপ করে গেলো। শুধু জাইফের গিটারটা বাজছে। বাতেন থেমে তাল দিচ্ছে, তিশি একমনে গেয়ে যাচ্ছে, গাওয়ার সময় হাত নাড়ছে। এটা অভ্যাস ওর। আগুনের আলোয় আবছায়া তিশিকে দেখতে যেকোনো অপরূপা রূপবতীর চেয়েও বেশি রূপবতী মনে হচ্ছে। আসলে অবশ্য ও এতটা সুন্দরী নয়। লম্বা করে, শুকনো চুল, কটকটে মুখ, সব মিলিয়ে সুন্দরী ওকে বলা যায় না। সবই হচ্ছে আলোকসজ্জার কারসাজি। আগুনের দৃপ্ত আলোয় যে কাউকেই সুন্দর মনে হবে।
উপস্থিত মানুষেরা এক অর্থে তন্ময় হয়ে তিশির গান শুনলো পুরোটা সময়। গান থামার পর হাতে গরম ফোটার ছোঁয়ায় আমি চমকে উঠে জয়োর দিকে তাকালাম। বিস্মিত হয়ে ওর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বললাম, " কী হয়েছে! "
জয়ো অন্যহাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, " কান্না পেলো। "
আমি আগের চেয়েও বিস্মিত গলায় বলে উঠলাম, " কেন! "
" এত সুন্দর করে গাইলো। আর ঐটা তো কান্না আসার মতোই গান। "
আমি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকলাম। মেয়েদের বোঝা কষ্টকর। উঁহু, জয়োকে বোঝার মতো কষ্টকর বোধহয় নয়!
•
অনেক রাত পর্যন্ত আমাদের আড্ডা চলল। জয়ো নিজেও দু একটা গান গাইলো। ওর গানের গলাও বেশ মিষ্টি, আগের দুজনের মতো না হলেও, বেশ লাগে শুনতে।
দেখতে দেখতে অনেক রাত হয়ে গেলো। বহুদিন পরের আড্ডা, কিছুতেই ভাঙতে চায় না। কিন্তু সকাল সাতটায় বাস। আর এখন বাজছে প্রায় তিনটার কাছাকাছি। যাদের রাত জাগার অভ্যেস নেই ওরা ইতোমধ্যেই উঠে পড়তে শুরু করেছে। আমি উঠছি না। আমার পাশে ঘুমঘুম চোখে জয়ো বসে আছে। ওর রাত জাগার তেমন অভ্যাস নেই। বড়জোর দুইটা কি সোয়া দুইটা, এরপর যে করেই হোক ঘুমিয়ে পড়বে।
" জয়ো, ঘুমাবা না?"
জয়ো বোধহয় এটা শোনারই অপেক্ষা করছিলো। জড়ানো গলায় বলল, " হ্যাঁ, চলো। "
আমি উঠে পড়লাম, জয়োও উঠে দাঁড়ালো। আমরা গুটি গুটি পায়ে আশরাফের বাংলোর দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। জয়োর বোধহয় বেশিই ঘুম পেয়েছে। এলোমেলো পা ফেলছে। হাই তোলা ওর পছন্দ নয়, তবুও বারদুই হাই দিয়ে ফেলেছে। আরেকটু আগেই বোধহয় ওঠা উচিত ছিলো। বেচারি! আবার সকালেও তো উঠতে হবে। ওর জন্য কষ্টকর হয়ে গেলো অনেক।
বাঙলোয় ঢোকার সময় দেখলাম, তিশি, নেলি, জাইফ আর আসাদ বসে আছে। মদ খাচ্ছে বোধহয়। কলেজের দিনগুলোতে গানের পরে ড্রিংক না করলে চলতই না ওদের। তিশি আর নেলি অবশ্য তেমন একটা খেতো না তখন। কী জানি এতোদিনে হয়তো অভ্যেস হয়েছে। সময় বদলায়, মানুষও বদলায়।গত রাতেও দেখলাম, এভাবে গ্লাস হাতে বসে আছে। তা থাকুক, যার যার জীবন, তার তার মর্জি।
আমি জয়োকে নিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছি, এমন সময় পেছন থেকে কে যেন নাম ধরে ডেকে উঠলো। তাকিয়ে দেখি জাইফ। ও আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে বলে উঠলো, " ভাবীকে রেখে একটু নিচে আসিস তো। "
আমি গলা নামিয়ে বললাম, " কেন? "
জাইফ আবারো ভ্রু উঁচিয়ে বলল, " আয় আগে। " আমি মাথা ঝাঁকিয়ে জয়োকে নিয়ে উপরে উঠে এলাম। ও বিছানায় যেতে যেতে মৃদু গলায় বলল, " জলদি আইসো। "
আমি মাথা ঝাঁকালাম।
" আমি কিন্তু ঘুমায় যাবো। তোমারে দেখার জন্য জেগে থাকবো না। বিশ্বাসটা রাইখো। "
আমি মুখ বিকৃত করে বললাম, " আচ্ছা আচ্ছা। ঘুমাও, কাল কিন্তু ভোরে উঠতে হবে। "
জয়ো মাথা ঝাকিয়ে কাথার নিচে ঢুকে পড়লো। আমি ঘর ছেড়ে বের হতে হতে ভাবলাম, জাইফ আবার কি বলবে আমাকে! ওদের সাথে তো কখনও-ই আমার তেমন ভালো কোনো সম্পর্ক ছিলো না। তিশির মাধ্যমে পরিচয় হয়েছিলো। মুখের চেনা শুধু।
আমার বুকে হঠাৎ একটা অজানা আশঙ্কা এসে ধাক্কা দিলো। তিশি ডাকালো নাকি ওকে দিয়ে!? কিন্তু ও কেন ডাকাবে!
আমি নিজের ওপর কিছুটা বিরক্ত হলাম। ধুর, ও আমাকে ডাকাতে পারবেই বা না কেন!
যাই, যেয়েই দেখি!
*
বাঙলোয় ঢোকার দরজার কাছে শান বাধানো কয়টা গাছ আছে। ওগুলোর একটায় ওরা বসে আছে। তিশিকে প্রথমে ওদের মাঝে দেখতে পেলাম না। তারপর দেখলাম, ও একটু দূরে, অন্য একটা গাছের নিচে বসে আছে।
জাইফ আমাকে হাত দিয়ে ইশারা করে তিশির কাছে যেতে বলল।
আমি বেশ কিছুক্ষণ ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে অনিশ্চিত পদক্ষেপে তিশির সামনে যেয়ে দাঁড়ালাম।
" বস। "
আমি ওর পাশে যেয়ে বসলাম। হালকা গলায় বললাম, " কিছু বলবি নাকি? "
তিশি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে জবাব দিলো, " না বললে তোরে ডাকলাম কী করতে? "
আমি হেসে ফেললাম। তিশিও হাসলো। হাসলে ওর গালে কেমন যেন ভাজ পড়ে। তখন ওকে দেখতে ভালো লাগে না। হাসার সময়ও যে কাউকে দেখে অসুন্দর মনে হতে পারে সেটা আমি ওর সাথে পরিচিত হয়েই প্রথম জেনেছিলাম। অবশ্য, শ্রী নিয়ে ওর খুব একটা বিকার নেই, ছিলোও না কোনোদিন।
" তারপর বল। চুপ মাইরা বইসা আসস কেন? "
তিশি ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে বলে উঠলো, " আমি কাল রাতে একটা কাজ করে ফেলসি। "
" কী করলি? "
" তোর বউরে একটা উলটাপালটা কথা বলে ফেলসি। "
আমি ভ্রু কুঁচকালাম। তাহলে এই কারণে জয়োর মুখ ভার ছিলো! কিন্তু জয়ো আমাকে বলল না কেন কথাটা? কী এমন বলেছে তিশি, কী এমন বলতে পারে ও! ওর সাথে তো পরিচয়ও আমার শুধু কলেজের দু বছর! মাত্র দুবছর! তাহলে?
আমি মৃদু গলায় বললাম, " কী বললি? "
" মোটামোটি ভালো ঝামেলার একটা কথা বলসি। "
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, " কী বললি সেটা বল।"
" দেখ, আমি... আই ওয়াজ ড্রাংক। তোর বউও বড় খোঁচা মারা কথা বলতেসিলো। তাই বের হয়ে গেছে মুখ থেকে। "
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, " খোঁচা মারা কথা মানে! "
তিশি মৃদু গলায় বলে উঠলো, " বাদদে। ভাবীরে আমার তরফ থিকা সরি বলে দিবি। বলবি আই ডিডেন্ট মিন দ্যাট। "
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম, " প্লিজ, প্লেন না চালায় একটু সোজা কথা বল। সরি বলার মতো কী এমন বলসিস তুই? আর সরি যদি বলতেই হয় তাহলে কাল বাসে বলে দিবি। তোরটা আমি বলবো কোন বিচারে! "
" আমি বাসে থাকবো না। "
আমি বিস্মিত গলায় বললাম, " ফিরবি না? "
" না। আমি এখন থেকে এখানেই থাকবো। আশরাফের সাথে আমার বিয়ে প্রায় ফাইনাল হয়ে গেছে। আর কয়দিন পরেই জানাবে সবাইরে। "
আমি পাথরের মতো জমে গেলাম। এক মুহূর্তের জন্য আমি তিশির চোখের দিকে তাকালাম, তারপরেই স্বাভাবিক হয়ে গেলাম। আমার পাথর হওয়ার কী আছে এখানে আশ্চর্য! মুখে স্বভাবসুলভ স্মিত হাসিটা ফুটিয়ে তুলে উচ্ছ্বাসের সাথে বলে উঠলাম, " ওরে! তলে তলে এতো দূর! "
তিশি হেসে ফেলে বলল, " ও এতোদিন ধরে আমার পেছন পড়ে রইলো। আর কতো ঠেকাই বল, আমারও তো বিবেক আছে! "
আমি শব্দ করে হেসে ফেলে বললাম, " বড়লোক হয়েই গেলা। "
তিশি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, " আফসোস, তোদের আগে হতে পারলাম না। "
" আর কিছু? যাই হোক, আমার বউয়ের সাথে কী ক্যাচাল লাগাইসিস সেটা বল। "
তিশির মুখের হাসিটা কেটে গেলো। পরিবেশটা কেমন হুট করেই গুমোট হয়ে গেলো।
" ঢঙ না কইরা বল, কি বলসিলি...", আমি তাড়া দিলাম।
তিশি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, " বলসিলাম, আমি বললে এখনও তুই ওকে ছেড়ে এখানে পড়ে থাকবি। "
আমি চোখ বড়বড় করে ফেললাম। এত, এতোগুলো দিন পর এটা কী শুনলাম আমি! এতোদিন পরেই কেন শুনতে হলো! আমার চোখের মণি কি কাঁপছে? কাঁপছে হয়তো!
" আই সেইড আই ওয়াজ ড্রাংক..."
" তোর এরম মনে হওয়ার পেছনে কারণ কী! "
তিশি আমার দিকে তাকিয়ে শব্দ না করেই হেসে উঠলো। তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যেয়ে বলে উঠলো, " ভুল ভেবেছি?"
আমি প্রায় চিৎকার করে বললাম, " তোর কী মনে হয়? "
তিশি আমার দিকে একটু সরে এসে হাতটা ঝট করে ধরে ফেলল। তারপর আবারো নিঃশব্দে হেসে উঠলো। বলল, " তুই না ডাক্তার? পালস মাপ নিজের। ওখানে তোর প্রশ্নের জবাব আছে। "
আমি ঠাণ্ডা গলায় বললাম, " ওটা তোর কথা শুনে বেড়েছে। "
" বেড়েছে নাকি? "
" তোর কী মনে হয়? "
তিশি তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলে উঠলো, " বাদদে। তোর বউ এমনিতেই চিন্তা আছে। আমার কথাটা বলা উচিত হয় নাই। কাল সরি বলে দিবো নে। "
আমি মাটির দিকে তাকিয়ে থাকলাম। কথার পিঠে আর কোনো কথা বললাম না। বলার মতো কিছু নেইও। হতাশা...একরাশ হতাশা মিশে থাকা তীব্র আক্ষেপ এসে আমাকে আকঁড়ে ধরতে চাইছে। আমি প্রানপণে স্বাভাবিক হতে চাইছি, কিন্তু মস্তিষ্ক তাতে সায় দিচ্ছে না, আমার কথা শুনছে না। ওটা বরং আরও বেশি বেশি আবেগপ্রবণ করে দিচ্ছে।
" আসি রে। "
তিশি উঠে একটা হাত আমার কাঁধের উপর রাখলো। তারপর আমার সমস্ত সত্তাটাকে প্রবলভাবে কাঁপিয়ে দিয়ে ও চলে গেলো।
আমি গাছের নিচে বসে বসে ওকে জাইফদের মাঝে বসে হুইস্কির গ্লাস হাতে নিতে দেখলাম। তারপর উঠে দাঁড়ালাম। ঘরে ফিরতে হবে, পৌনে এক ঘন্টার মতো হয়ে যাচ্ছে প্রায়, জয়ো উঠে দেখতে না পেলে আবার অন্য ঝামেলা বাধাবে। এমনিতেই যে কথা কানে গেছে ওর!
তিশিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। আমার এমন কেন অনুভূত হচ্ছে! তিশিকে আমি পছন্দ করতাম, আসলেই করতাম। কিন্তু খুব করে কি করতাম? খুব করে পছন্দ করলে কি একবারের জন্য হলেও জানিয়ে দিয়ে যাচাই করে দেখতাম না যে ও আমাকে ভালোবাসে নাকি? অল্পবয়সে, এমন তো কতজনই কতজনকে পছন্দ করে!
•
ভোরে জয়োকে ধাক্কাধাক্কি করে জাগাতে হলো। এতো ঘুম মেয়েটার, একেবারে বাড়াবাড়ি রকমের!
ব্যাগ ট্যাগ গুছিয়ে নিচে নেমে এলাম। বাস চলে এসেছে। লোকজন অল্পস্বল্প করে উঠতে শুরু করেছে। তিশি ঐ দূরে জাইফদের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। আশরাফকে কোথায় দেখতে পেলাম না। শরীরটা বোধহয় এখনও ভালো হয় নি ওর। বেচারা এতো বড় একটা পুনর্মিলন অনুষ্ঠান আয়োজন করলো, অথচ একটা দিন আমাদের সাথে থাকতে পারলো না। ভাগ্য মন্দ হলে যা হয়!
আমরা বাসে উঠে যাবো উঠে যাবো করছি, তখন তিশি এলো। জয়োকে নিয়ে একটু দূরে যেয়ে দাঁড়ালো। খুব বেশি সময় কথা বলল না ওরা, বেশ কম সময়ই নিলো। আমি দূর থেকে ওদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তিশি ওর সহজাত ভঙ্গিমায় হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছিলো, আর জয়ো নিজের স্বভাবসুলভতায় কথা বলতে বলতে ধীর গতিতে মাথা দোলাচ্ছিলো।
জয়ো ফিরে আমার পাশে এসে দাঁড়াতেই তিশি আমাদের দিকে তাকিয়ে শূন্যে হাত তুলে বিদায় জানালো। আমি আর জয়ো জবাবে স্মিত হাসি হেসে মাথা দোলালাম, তারপর বাসে উঠে সিটে যেয়ে বসে পড়লাম।
বাসটা একটু পরেই ছেড়ে দিলো। প্রায় অনেকটা সময় আমাদের মাঝে কোনো কথা হলো না। তারপর হঠাৎ জয়ো আমার হাতটা নিজের কোলের উপর টেনে নিয়ে নিজের মুখটাকে আমার কাঁধের উপর এলিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো, " তিশি মেয়েটা তোমাকে পছন্দ করতো জানো! "
আমি বাস্তবিক অর্থেই বিস্মিত হলাম। প্রবল বিস্ময়েই বললাম, " বলো কী!"
জয়ো হাসতে হাসতে বলে উঠলো, " তোমাকেও কেউ পছন্দ করতে পারে এটা আমার চিন্তারও বাইরে ছিলো! "
আমি ওর হাসির সঙ্গে তাল মেলালাম৷
" তুমি আবার পছন্দ টছন্দ করতা না তো? "
আমি ভ্রু কুঁচকে ফেলে বললাম," আরে নাহ, আমাদের পরিচয়ই তো দুই বছরের। তাও, খুব কম সময়ের জন্য। "
জয়ো নির্ভার গলায় বলল, " হুম, আচ্ছা। "
ও চুপ করে গেলো। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম গোপনে। আমার জন্য এই বাস যাত্রাটুকু বেশ দীর্ঘ হবে। কোলে ভালোবাসার মানুষের হাত, কাঁধে চুলের সুরসুরি, কিন্তু তবুও কোন ভালোবাসার অভাবে "ব্যাগ গুছাইসো?"
" না গোছানোর কী আছে? "
আমি চুপ হয়ে গেলাম। জয়ো এভাবে কথা বলছে কেন! সেই কাল থেকেই গলার স্বর কেমন ঠান্ডা, মুখেও প্রচ্ছন্ন থমথমে ভাব। কেউ কি কিছু বলেছে ওকে? নাকি আমিই কিছু করেছি! অবশ্য ওর রাগ এমনিতেই বেশি। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে হুট করে মুখ ভার করে ফেলে, বাচ্চাদের মতো বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মানাতে হয়। কী অদ্ভুত বলেন, ছেলেমেয়ে পালা ঝামেলা দেখে আমি সারা জীবন সন্তান শূন্য সংসার কল্পনা করেছি, আর এখন নিজের বউই বাচ্চামো করে! তাতে যদিও আমার তেমন একটা বিরক্ত লাগে না, বরং 'কেউ আমার ওপর অভিমান করেছে এবং আমি তার অভিমান ভাঙাতে পারছি' এই উপলব্ধিগুলো নিজের কাছে বেশ ভালোই লাগে। পুরো ব্যাপারটায় আলাদা একট সুখ আছে।
" চলো বাইরে থেকে ঘুইরা আসি। "
জয়োর মুখ আরও থমথমে হয়ে গেলো নাকি আমিই ভুল দেখলাম, কী জানি! আমি সামান্য অসহায়াভাব গলায় ফুটিয়ে বললাম, " কালকে সকালে তো চলেই যাইতেসি। চলো না..."
ও বিছানার একপাশে পা তুলে বসে পড়লো। কোনও কথা বলল না। আমি ছোট্ট করে একটা শ্বাস ছাড়লাম। মৃদু গলায় বললাম, " কী হইসে তোমার? কেউ কিছু বলসে? মন খারাপ কেন তোমার? "
জয়ো আমার কথা শুনতে পেয়েছে বলে মনে হলো না। আমার চেয়ে নিজের পায়ের আঙ্গুলের নখের দিকে মনোযোগ বেশি ওর। এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওগুলোর দিকে। ভেতরে ভেতরে আমি একটু একটু বিরক্তি অনুভব করা শুরু করছি, টের পেলাম। কতক্ষণই আর সাধা যায়! তাছাড়া এসেছি বন্ধুদের মাঝে, ওকে তো সাথে আনার কথাই ছিলো না। আতিফ বাদে অন্য কোনো বন্ধু বউ আনেও নি। প্রায়োরিটি, গুরুত্ব কি সব সময় সমানভাবে দেয়া যায়? বোকা মেয়ে এই ব্যাপারটা বুঝতেই চায় না!
কিছুটা বিরক্তি নিয়েই আমি বলে উঠলাম, " আচ্ছা থাকো তাহলে। আমি যাই, ওরা উঠোনে বসছে। আসতে চাইলে আইসা পইড়ো, লজ্জা কইরো না। "
জয়ো ঝট করে আমার দিকে তাকালো। আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। ও খাট থেকে নামতে নামতে বলল, " না থাক, চলো আমিও যাবো তোমার সাথে। "
আমি হেসে ফেললাম শব্দ করে। জয়ো এসে আমার মাথায় এত জোরে চাটি মারলো যে এক নিমিষে আমার মুখ বন্ধ হয়ে গেলো। তাতে হাসি অবশ্য থামলো না, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে জায়গা নিয়ে ঠিকই ঝুলে রইলো।
২
রাতটা শীতের রাত না, কিন্তু তবুও উঠোনের মাঝখানে আগুন জ্বালানো হয়েছে। আমরা বন্ধুরা সেটাকে ঘিরে বসে বড় একটা বৃত্ত তৈরি করেছি। জাইফের কোলে গিটার। আসাদের হাতে মাউথ অরগান। চিন্ময়ীর কাছে একটা বেহালাও দেখেছিলাম। সেটা অবশ্য এখন এই আসরে দেখা যাচ্ছে না।
নেলি গান গাওয়ার জন্য গলা ঠিক করছে। আর রিফু অনবরত কথা বলে যাচ্ছে। বাকিরা কেউ ওদের দিকে তাকিয়ে আছে, কেউ দুপাশের বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে চাপা গলায় কথা বলছে। বলতে বলতেই হাহা করে হেসে উঠছে। আমার হঠাৎ মনে মনে কেমন একটু আফসোসই অনুভূত হলো। জয়োকে না আনলেই বোধহয় ভালো হত। হাজার হোক, বউয়ের সামনে তো আর সবকিছু বলা যায় না বন্ধু-বান্ধবীদের। আর, আমি যদি বলে ফেলিও, ওরা তো আমার বউয়ের সামনে সেসব নিয়ে আলাপ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে না। সব সম্পর্কের একটা আলাদা সুর থাকে। বউ পাশে রেখে কি আর বন্ধুত্বের সুরে তাল মেলানো যায়?
আমি আড়চোখে জয়োর দিকে তাকালাম। আমার পায়ের উপর হাত রেখে কাত হয়ে বসে আছে। মাথার চুলগুলো বেণি করা। কতবার বললাম ওকে, বেণি করো না। ওভাবে তোমাকে ভালো লাগে না। কই আর শুনলো!
নেলি গান শুরু করবে মনে হচ্ছে। তিশিও এখন আগুনের কাছাকাছি চলে এসেছে। ও-ও গাইবে মনে হচ্ছে।
" রুদ্র? "
আমি জয়োর দিকে তাকিয়ে জবাব দিলাম, " হু? "
ও মৃদু গলায় বলে উঠলো, " ঐ মেয়েটা কে? "
" কোনটা? "
" ঐ যে হলুদ শাড়ি পরে আছে যে..."
" ও? ও হচ্ছে তিশি। প্রথম দিন পরিচয় করায় দিসিলাম তো তোমাদের। "
" দিসিলা? "
আমি চোখ ছোটছোট করে আস্তে করে মাথা দোলালাম।
জয়ো সম্ভবত আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো, নেলি গান শুরু করে দেয়ায় চুপ করে গেলো। গিটার বাজাচ্ছে জাইফ। মাউথ অরগান মুখে নিয়ে আসাদ বসে আছে। আর একটু সময় গেলে পরে বোধহয় বাজাতে শুরু করবে। তিশিও মৃদু মৃদু হাত নাড়ছে। এই মেয়েটাকে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে জরা এখন পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারে নি। এখনও একদম সেই ইন্টারে পরা সময়ের মতোই আছে! একটুও বদলায় নি। একদম একটুও না!
তিশি একসময় গান শুরু করলো। ওর গানের গলা অস্বাভাবিক রকমের ভালো। গানের সাথে সাথে মনে হয় মায়া ঝরে পড়ছে গলা থেকে। আমাদের পুরোদল এক নিমিষে চুপ করে গেলো। শুধু জাইফের গিটারটা বাজছে। বাতেন থেমে তাল দিচ্ছে, তিশি একমনে গেয়ে যাচ্ছে, গাওয়ার সময় হাত নাড়ছে। এটা অভ্যাস ওর। আগুনের আলোয় আবছায়া তিশিকে দেখতে যেকোনো অপরূপা রূপবতীর চেয়েও বেশি রূপবতী মনে হচ্ছে। আসলে অবশ্য ও এতটা সুন্দরী নয়। লম্বা করে, শুকনো চুল, কটকটে মুখ, সব মিলিয়ে সুন্দরী ওকে বলা যায় না। সবই হচ্ছে আলোকসজ্জার কারসাজি। আগুনের দৃপ্ত আলোয় যে কাউকেই সুন্দর মনে হবে।
উপস্থিত মানুষেরা এক অর্থে তন্ময় হয়ে তিশির গান শুনলো পুরোটা সময়। গান থামার পর হাতে গরম ফোটার ছোঁয়ায় আমি চমকে উঠে জয়োর দিকে তাকালাম। বিস্মিত হয়ে ওর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বললাম, " কী হয়েছে! "
জয়ো অন্যহাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, " কান্না পেলো। "
আমি আগের চেয়েও বিস্মিত গলায় বলে উঠলাম, " কেন! "
" এত সুন্দর করে গাইলো। আর ঐটা তো কান্না আসার মতোই গান। "
আমি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকলাম। মেয়েদের বোঝা কষ্টকর। উঁহু, জয়োকে বোঝার মতো কষ্টকর বোধহয় নয়!
•
অনেক রাত পর্যন্ত আমাদের আড্ডা চলল। জয়ো নিজেও দু একটা গান গাইলো। ওর গানের গলাও বেশ মিষ্টি, আগের দুজনের মতো না হলেও, বেশ লাগে শুনতে।
দেখতে দেখতে অনেক রাত হয়ে গেলো। বহুদিন পরের আড্ডা, কিছুতেই ভাঙতে চায় না। কিন্তু সকাল সাতটায় বাস। আর এখন বাজছে প্রায় তিনটার কাছাকাছি। যাদের রাত জাগার অভ্যেস নেই ওরা ইতোমধ্যেই উঠে পড়তে শুরু করেছে। আমি উঠছি না। আমার পাশে ঘুমঘুম চোখে জয়ো বসে আছে। ওর রাত জাগার তেমন অভ্যাস নেই। বড়জোর দুইটা কি সোয়া দুইটা, এরপর যে করেই হোক ঘুমিয়ে পড়বে।
" জয়ো, ঘুমাবা না?"
জয়ো বোধহয় এটা শোনারই অপেক্ষা করছিলো। জড়ানো গলায় বলল, " হ্যাঁ, চলো। "
আমি উঠে পড়লাম, জয়োও উঠে দাঁড়ালো। আমরা গুটি গুটি পায়ে আশরাফের বাংলোর দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। জয়োর বোধহয় বেশিই ঘুম পেয়েছে। এলোমেলো পা ফেলছে। হাই তোলা ওর পছন্দ নয়, তবুও বারদুই হাই দিয়ে ফেলেছে। আরেকটু আগেই বোধহয় ওঠা উচিত ছিলো। বেচারি! আবার সকালেও তো উঠতে হবে। ওর জন্য কষ্টকর হয়ে গেলো অনেক।
বাঙলোয় ঢোকার সময় দেখলাম, তিশি, নেলি, জাইফ আর আসাদ বসে আছে। মদ খাচ্ছে বোধহয়। কলেজের দিনগুলোতে গানের পরে ড্রিংক না করলে চলতই না ওদের। তিশি আর নেলি অবশ্য তেমন একটা খেতো না তখন। কী জানি এতোদিনে হয়তো অভ্যেস হয়েছে। সময় বদলায়, মানুষও বদলায়।গত রাতেও দেখলাম, এভাবে গ্লাস হাতে বসে আছে। তা থাকুক, যার যার জীবন, তার তার মর্জি।
আমি জয়োকে নিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছি, এমন সময় পেছন থেকে কে যেন নাম ধরে ডেকে উঠলো। তাকিয়ে দেখি জাইফ। ও আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে বলে উঠলো, " ভাবীকে রেখে একটু নিচে আসিস তো। "
আমি গলা নামিয়ে বললাম, " কেন? "
জাইফ আবারো ভ্রু উঁচিয়ে বলল, " আয় আগে। " আমি মাথা ঝাঁকিয়ে জয়োকে নিয়ে উপরে উঠে এলাম। ও বিছানায় যেতে যেতে মৃদু গলায় বলল, " জলদি আইসো। "
আমি মাথা ঝাঁকালাম।
" আমি কিন্তু ঘুমায় যাবো। তোমারে দেখার জন্য জেগে থাকবো না। বিশ্বাসটা রাইখো। "
আমি মুখ বিকৃত করে বললাম, " আচ্ছা আচ্ছা। ঘুমাও, কাল কিন্তু ভোরে উঠতে হবে। "
জয়ো মাথা ঝাকিয়ে কাথার নিচে ঢুকে পড়লো। আমি ঘর ছেড়ে বের হতে হতে ভাবলাম, জাইফ আবার কি বলবে আমাকে! ওদের সাথে তো কখনও-ই আমার তেমন ভালো কোনো সম্পর্ক ছিলো না। তিশির মাধ্যমে পরিচয় হয়েছিলো। মুখের চেনা শুধু।
আমার বুকে হঠাৎ একটা অজানা আশঙ্কা এসে ধাক্কা দিলো। তিশি ডাকালো নাকি ওকে দিয়ে!? কিন্তু ও কেন ডাকাবে!
আমি নিজের ওপর কিছুটা বিরক্ত হলাম। ধুর, ও আমাকে ডাকাতে পারবেই বা না কেন!
যাই, যেয়েই দেখি!
*
বাঙলোয় ঢোকার দরজার কাছে শান বাধানো কয়টা গাছ আছে। ওগুলোর একটায় ওরা বসে আছে। তিশিকে প্রথমে ওদের মাঝে দেখতে পেলাম না। তারপর দেখলাম, ও একটু দূরে, অন্য একটা গাছের নিচে বসে আছে।
জাইফ আমাকে হাত দিয়ে ইশারা করে তিশির কাছে যেতে বলল।
আমি বেশ কিছুক্ষণ ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে অনিশ্চিত পদক্ষেপে তিশির সামনে যেয়ে দাঁড়ালাম।
" বস। "
আমি ওর পাশে যেয়ে বসলাম। হালকা গলায় বললাম, " কিছু বলবি নাকি? "
তিশি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে জবাব দিলো, " না বললে তোরে ডাকলাম কী করতে? "
আমি হেসে ফেললাম। তিশিও হাসলো। হাসলে ওর গালে কেমন যেন ভাজ পড়ে। তখন ওকে দেখতে ভালো লাগে না। হাসার সময়ও যে কাউকে দেখে অসুন্দর মনে হতে পারে সেটা আমি ওর সাথে পরিচিত হয়েই প্রথম জেনেছিলাম। অবশ্য, শ্রী নিয়ে ওর খুব একটা বিকার নেই, ছিলোও না কোনোদিন।
" তারপর বল। চুপ মাইরা বইসা আসস কেন? "
তিশি ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে বলে উঠলো, " আমি কাল রাতে একটা কাজ করে ফেলসি। "
" কী করলি? "
" তোর বউরে একটা উলটাপালটা কথা বলে ফেলসি। "
আমি ভ্রু কুঁচকালাম। তাহলে এই কারণে জয়োর মুখ ভার ছিলো! কিন্তু জয়ো আমাকে বলল না কেন কথাটা? কী এমন বলেছে তিশি, কী এমন বলতে পারে ও! ওর সাথে তো পরিচয়ও আমার শুধু কলেজের দু বছর! মাত্র দুবছর! তাহলে?
আমি মৃদু গলায় বললাম, " কী বললি? "
" মোটামোটি ভালো ঝামেলার একটা কথা বলসি। "
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, " কী বললি সেটা বল।"
" দেখ, আমি... আই ওয়াজ ড্রাংক। তোর বউও বড় খোঁচা মারা কথা বলতেসিলো। তাই বের হয়ে গেছে মুখ থেকে। "
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, " খোঁচা মারা কথা মানে! "
তিশি মৃদু গলায় বলে উঠলো, " বাদদে। ভাবীরে আমার তরফ থিকা সরি বলে দিবি। বলবি আই ডিডেন্ট মিন দ্যাট। "
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম, " প্লিজ, প্লেন না চালায় একটু সোজা কথা বল। সরি বলার মতো কী এমন বলসিস তুই? আর সরি যদি বলতেই হয় তাহলে কাল বাসে বলে দিবি। তোরটা আমি বলবো কোন বিচারে! "
" আমি বাসে থাকবো না। "
আমি বিস্মিত গলায় বললাম, " ফিরবি না? "
" না। আমি এখন থেকে এখানেই থাকবো। আশরাফের সাথে আমার বিয়ে প্রায় ফাইনাল হয়ে গেছে। আর কয়দিন পরেই জানাবে সবাইরে। "
আমি পাথরের মতো জমে গেলাম। এক মুহূর্তের জন্য আমি তিশির চোখের দিকে তাকালাম, তারপরেই স্বাভাবিক হয়ে গেলাম। আমার পাথর হওয়ার কী আছে এখানে আশ্চর্য! মুখে স্বভাবসুলভ স্মিত হাসিটা ফুটিয়ে তুলে উচ্ছ্বাসের সাথে বলে উঠলাম, " ওরে! তলে তলে এতো দূর! "
তিশি হেসে ফেলে বলল, " ও এতোদিন ধরে আমার পেছন পড়ে রইলো। আর কতো ঠেকাই বল, আমারও তো বিবেক আছে! "
আমি শব্দ করে হেসে ফেলে বললাম, " বড়লোক হয়েই গেলা। "
তিশি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, " আফসোস, তোদের আগে হতে পারলাম না। "
" আর কিছু? যাই হোক, আমার বউয়ের সাথে কী ক্যাচাল লাগাইসিস সেটা বল। "
তিশির মুখের হাসিটা কেটে গেলো। পরিবেশটা কেমন হুট করেই গুমোট হয়ে গেলো।
" ঢঙ না কইরা বল, কি বলসিলি...", আমি তাড়া দিলাম।
তিশি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, " বলসিলাম, আমি বললে এখনও তুই ওকে ছেড়ে এখানে পড়ে থাকবি। "
আমি চোখ বড়বড় করে ফেললাম। এত, এতোগুলো দিন পর এটা কী শুনলাম আমি! এতোদিন পরেই কেন শুনতে হলো! আমার চোখের মণি কি কাঁপছে? কাঁপছে হয়তো!
" আই সেইড আই ওয়াজ ড্রাংক..."
" তোর এরম মনে হওয়ার পেছনে কারণ কী! "
তিশি আমার দিকে তাকিয়ে শব্দ না করেই হেসে উঠলো। তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যেয়ে বলে উঠলো, " ভুল ভেবেছি?"
আমি প্রায় চিৎকার করে বললাম, " তোর কী মনে হয়? "
তিশি আমার দিকে একটু সরে এসে হাতটা ঝট করে ধরে ফেলল। তারপর আবারো নিঃশব্দে হেসে উঠলো। বলল, " তুই না ডাক্তার? পালস মাপ নিজের। ওখানে তোর প্রশ্নের জবাব আছে। "
আমি ঠাণ্ডা গলায় বললাম, " ওটা তোর কথা শুনে বেড়েছে। "
" বেড়েছে নাকি? "
" তোর কী মনে হয়? "
তিশি তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলে উঠলো, " বাদদে। তোর বউ এমনিতেই চিন্তা আছে। আমার কথাটা বলা উচিত হয় নাই। কাল সরি বলে দিবো নে। "
আমি মাটির দিকে তাকিয়ে থাকলাম। কথার পিঠে আর কোনো কথা বললাম না। বলার মতো কিছু নেইও। হতাশা...একরাশ হতাশা মিশে থাকা তীব্র আক্ষেপ এসে আমাকে আকঁড়ে ধরতে চাইছে। আমি প্রানপণে স্বাভাবিক হতে চাইছি, কিন্তু মস্তিষ্ক তাতে সায় দিচ্ছে না, আমার কথা শুনছে না। ওটা বরং আরও বেশি বেশি আবেগপ্রবণ করে দিচ্ছে।
" আসি রে। "
তিশি উঠে একটা হাত আমার কাঁধের উপর রাখলো। তারপর আমার সমস্ত সত্তাটাকে প্রবলভাবে কাঁপিয়ে দিয়ে ও চলে গেলো।
আমি গাছের নিচে বসে বসে ওকে জাইফদের মাঝে বসে হুইস্কির গ্লাস হাতে নিতে দেখলাম। তারপর উঠে দাঁড়ালাম। ঘরে ফিরতে হবে, পৌনে এক ঘন্টার মতো হয়ে যাচ্ছে প্রায়, জয়ো উঠে দেখতে না পেলে আবার অন্য ঝামেলা বাধাবে। এমনিতেই যে কথা কানে গেছে ওর!
তিশিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। আমার এমন কেন অনুভূত হচ্ছে! তিশিকে আমি পছন্দ করতাম, আসলেই করতাম। কিন্তু খুব করে কি করতাম? খুব করে পছন্দ করলে কি একবারের জন্য হলেও জানিয়ে দিয়ে যাচাই করে দেখতাম না যে ও আমাকে ভালোবাসে নাকি? অল্পবয়সে, এমন তো কতজনই কতজনকে পছন্দ করে!
•
ভোরে জয়োকে ধাক্কাধাক্কি করে জাগাতে হলো। এতো ঘুম মেয়েটার, একেবারে বাড়াবাড়ি রকমের!
ব্যাগ ট্যাগ গুছিয়ে নিচে নেমে এলাম। বাস চলে এসেছে। লোকজন অল্পস্বল্প করে উঠতে শুরু করেছে। তিশি ঐ দূরে জাইফদের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। আশরাফকে কোথায় দেখতে পেলাম না। শরীরটা বোধহয় এখনও ভালো হয় নি ওর। বেচারা এতো বড় একটা পুনর্মিলন অনুষ্ঠান আয়োজন করলো, অথচ একটা দিন আমাদের সাথে থাকতে পারলো না। ভাগ্য মন্দ হলে যা হয়!
আমরা বাসে উঠে যাবো উঠে যাবো করছি, তখন তিশি এলো। জয়োকে নিয়ে একটু দূরে যেয়ে দাঁড়ালো। খুব বেশি সময় কথা বলল না ওরা, বেশ কম সময়ই নিলো। আমি দূর থেকে ওদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তিশি ওর সহজাত ভঙ্গিমায় হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছিলো, আর জয়ো নিজের স্বভাবসুলভতায় কথা বলতে বলতে ধীর গতিতে মাথা দোলাচ্ছিলো।
জয়ো ফিরে আমার পাশে এসে দাঁড়াতেই তিশি আমাদের দিকে তাকিয়ে শূন্যে হাত তুলে বিদায় জানালো। আমি আর জয়ো জবাবে স্মিত হাসি হেসে মাথা দোলালাম, তারপর বাসে উঠে সিটে যেয়ে বসে পড়লাম।
বাসটা একটু পরেই ছেড়ে দিলো। প্রায় অনেকটা সময় আমাদের মাঝে কোনো কথা হলো না। তারপর হঠাৎ জয়ো আমার হাতটা নিজের কোলের উপর টেনে নিয়ে নিজের মুখটাকে আমার কাঁধের উপর এলিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো, " তিশি মেয়েটা তোমাকে পছন্দ করতো জানো! "
আমি বাস্তবিক অর্থেই বিস্মিত হলাম। প্রবল বিস্ময়েই বললাম, " বলো কী!"
জয়ো হাসতে হাসতে বলে উঠলো, " তোমাকেও কেউ পছন্দ করতে পারে এটা আমার চিন্তারও বাইরে ছিলো! "
আমি ওর হাসির সঙ্গে তাল মেলালাম৷
" তুমি আবার পছন্দ টছন্দ করতা না তো? "
আমি ভ্রু কুঁচকে ফেলে বললাম," আরে নাহ, আমাদের পরিচয়ই তো দুই বছরের। তাও, খুব কম সময়ের জন্য। "
জয়ো নির্ভার গলায় বলল, " হুম, আচ্ছা। "
ও চুপ করে গেলো। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম গোপনে। আমার জন্য এই বাস যাত্রাটুকু বেশ দীর্ঘ হবে। কোলে ভালোবাসার মানুষের হাত, কাঁধে চুলের সুরসুরি, কিন্তু তবুও কোন ভালোবাসার অভাবে আমার সমস্ত হৃদয় এমন খাঁ খাঁ করছে এর উত্তর ভুলে যেতে আমার অনেক, বেশ অনেকটা সময়ই লেগে যাবে!
আমি আবার একবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। তারপর ডান হাতটা জয়োর কোল থেকে সরিয়ে ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে ধরতে ভাবলাম, এই অনুষ্ঠানটায় না এলেই বোধহয় ভালো হতো।
(সমাপ্ত)
About the Author
Rifu