Fiction

বিষণ্ণ বিকেল

Excerpt

সেদিন পার্থ বুঝেছিল, মানুষ কখনো কখনো নিজের সবচেয়ে বড় শত্রু নিজেই।

Tasnia Khan —
বিষণ্ণ বিকেল

বহু বছর ধরে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত বাড়িটা বেশ মনে ধরেছে অলোকের। পুরোনো হলেও বাড়িটার অবস্থা ভালো। মেরামত করে নিজের মতো সাজালে দেখার মতো হবে। সামনেও বেশ অনেকটা জায়গা। বড় কথা, তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে বাড়িটা।

সম্ভবত বাড়িটার কোনো দোষ আছে। অবশ্য এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না অলোক। স্বল্পমূল্যে আস্ত একটা বাড়ি পাচ্ছে, এটাই অনেক। মনে মনে ছক কষে ফেলে, বাড়িটা নিজের হাতে এলে কী করবে, কীভাবে সাজাবে।

বাড়ির সামনে বসে একমনে ভাবছিল সে। আজ হঠাৎ করেই বাড়ি দেখতে চলে এসেছে। স্ত্রী সুনিতাকে সঙ্গে আনতে চেয়েছিল, কিন্তু সুনিতার বান্ধবীর ছেলের জন্মদিন থাকায় ওর আসা হয়নি। তবে সমস্যা নেই, আরেক দিন সময় করে অবশ্যই নিয়ে আসবে।

বিকেলের রোদ মরে এসেছে। শেষ বিকেলের আলোয় ঝোপঝাড়ে ঘেরা পরিত্যক্ত বাড়িটাকে অপার্থিব সুন্দর লাগছে। কালের আবর্তে বাড়ির দেয়ালে শ্যাওলা জমেছে, রং চটে গেছে, চারপাশে জন্ম নিয়েছে বুনো লতাপাতা আর ঝোপঝাড়। তবু বাড়িটার মধ্যে এক ধরনের মায়া আছে।

এই বাড়িটায় হয়তো আগের বাসিন্দাদের অনেক স্মৃতি, অনেক গল্প জমে আছে।

অলোক আসলে মূল মালিকের কাছ থেকে বাড়িটা কিনছে না। আসল মালিকের ভাইয়ের কাছ থেকে কিনছে। মালিকের মৃত্যুর পর আইনিভাবে সম্পত্তির অধিকার পেয়েছেন তাঁর ভাই, আর এখন সেই তিনিই বাড়িটি বিক্রি করছেন।

— "আপনি কি বাড়িটা কিনবেন?"

হঠাৎ প্রশ্ন শুনে চমকে ওঠে অলোক। পিছন ফিরে দেখে একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন।

— "হ্যাঁ, কিনতে চাই। কথাবার্তা প্রায় চূড়ান্ত। শুধু কিছু আনুষ্ঠানিকতা বাকি।"

অলোকের উত্তরে ভদ্রলোকের মুখে মৃদু বিষণ্নতার ছাপ ফুটে ওঠে।

অলোক ভাবে, হয়তো ভদ্রলোকও বাড়িটা কিনতে চেয়েছিলেন। এখন হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বলে মন খারাপ।

ভদ্রলোক আবার বললেন,

— "বাড়িটা তো অনেক বছর ধরে খালি পড়ে আছে। টাকা দিয়ে এমন বাড়ি কিনবেন?"

এবার অলোক খানিকটা বিরক্ত হয়। তার ইচ্ছা, সে বাড়ি কিনবে— তাতে এই অপরিচিত লোকটির কী? তবু ভদ্রতা বজায় রেখে বলল,

— "আসলে কী জানেন, বাড়িটা খুব কম দামে পাচ্ছি। আর পুরোনো বাড়িঘর আমার ভীষণ পছন্দ। বাড়িটা সুন্দর, অবস্থাও ভালো। একটু সংস্কার করলেই নতুনের মতো হয়ে যাবে।"

ভদ্রলোক মৃদু হেসে বললেন,

— "তা তো হবেই। কত আশা, কত যত্ন নিয়ে বানানো হয়েছিল বাড়িটা।"

লোকটির কণ্ঠে এমন এক বিষণ্নতা ছিল, যেন বাড়িটার সঙ্গে তাঁর নিজেরও কোনো সম্পর্ক আছে।

অলোক কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— "আপনি কি এখানকার লোক?"

— "হ্যাঁ, এখানেই থাকি। তা ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার উপায়ও নেই।"

মৃদু হেসে উত্তর দিলেন তিনি।

উত্তরটা অদ্ভুত লাগলেও অলোক গুরুত্ব দিল না। বরং মনে হলো, লোকটি যেহেতু স্থানীয়, নিশ্চয়ই বাড়িটির ইতিহাস জানবেন।

সে বলল,

— "তা বলছিলাম, এত সুন্দর একটা বাড়ি এত দিন খালি পড়ে রইল কেন? শুনেছি আগের মালিকের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না। আপনি কি কিছু জানেন?"

ভদ্রলোকের চোখে তখন অদ্ভুত এক ছায়া নেমে এলো।

— "আমার চেয়ে আর কে ভালো বলতে পারবে? সে এক করুণ ইতিহাস।"

তিনি গেটের পাশে কাঠগোলাপ গাছের নিচে বাঁধানো বেদির দিকে ইশারা করলেন।

— "এসুন, বসুন।"

অলোক গিয়ে বসল।

গাছটা বেশ পুরোনো। শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাদা ফুলে ভরে আছে চারপাশ। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে কাঠগোলাপের মিষ্টি গন্ধ।

ভদ্রলোক ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—

— "এই বাড়ির মালিক ছিল পার্থ। ভীষন একা আর ভাগ্যাহত মানুষ"

ভদ্রলোক কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। যেন স্মৃতির কোনো গভীর অন্ধকারে ডুবে গেছেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—

— "পার্থ, খুব গম্ভীর, কাজপাগল, খানিকটা বেরসিক মানুষ। কিছু মানুষ থাকে না, যারা পৃথিবীর রং-রূপ, আনন্দ-উৎসব কিংবা মানুষের ভিড়ে নিজেকে খুঁজে পায় না? পার্থ ছিল ঠিক তেমনই।

ছোটবেলা থেকেই জীবন তাকে সহজ কিছু দেয়নি। সংগ্রাম করতে করতে বড় হয়েছে। সেই সংগ্রাম তার ভেতর থেকে কোমলতা কেড়ে নিয়েছিল। মানুষটাকে কঠিন, রুক্ষ আর একরোখা করে তুলেছিল।

নিজের উপার্জিত অর্থে এই বাড়িটা কিনেছিল সে। একাই থাকত এখানে। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল খুবই কম। বন্ধু বলতে হাতে গোনা কয়েকজন। মানুষের সঙ্গে মিশতে তার ভালো লাগত না। নিজের কাজ আর নিজের জগৎ নিয়েই ছিল ব্যস্ত।

কিন্তু মানুষের জীবন সব সময় একই রকম থাকে না।

একদিন পার্থর জীবনেও প্রেম এসেছিল।

যে মানুষটা ভালোবাসা, সম্পর্ক কিংবা আবেগের প্রতি উদাসীন ছিল, সেই মানুষটাই একদিন ভালোবেসে ফেলেছিল বিভাবরীকে।

বিভাবরী...

পার্থর জীবনে সে এসেছিল ঠিক খরার পরে নামা প্রথম বৃষ্টির মতো।

বয়সে পার্থর চেয়ে কিছুটা ছোট। প্রাণবন্ত, হাসিখুশি, উচ্ছল এক তরুণী। যার হাসি দেখলে মনে হতো পৃথিবীতে কোনো দুঃখ নেই।

কিছু মানুষ আছে, যারা নিজের অজান্তেই চারপাশে আলো ছড়িয়ে দেয়। বিভাবরী ছিল তেমনই একজন।

তার রঙিন উপস্থিতি ছুঁয়ে গিয়েছিল পার্থর দীর্ঘদিনের সাদাকালো জীবনকেও।

ওদের প্রেমটা ছিল অদ্ভুত।

অনেকেই অবাক হয়েছিল।

বিভাবরীর মতো সুন্দরী, শিক্ষিতা, উচ্চবংশীয় এক তরুণী কী করে এমন গম্ভীর, রাগী আর সাধারণ চেহারার একজন মানুষকে ভালোবাসতে পারে?

কিন্তু ভালোবাসা তো হিসাব মেনে আসে না।

বিভাবরী পার্থকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছিল।

অন্যদিকে পার্থও নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে ভালোবেসেছিল বিভাবরীকে।

দুইজন ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানুষ।

একজন ছিল বসন্তের রঙিন প্রজাপতি, অন্যজন শীতের কুয়াশার মতো নীরব।

তবু তারা একে অপরকে ছাড়া থাকতে পারত না।

ভালোবাসা মানুষকে বদলে দেয়।

বিভাবরীর জন্য পার্থ নিজের রাগকে সংযত করতে শিখেছিল। আর পার্থর জন্য বিভাবরী নিজের কিছু ছেলেমানুষি আচরণ কমিয়েছিল।

দুজনই চেষ্টা করছিল মাঝামাঝি কোথাও এসে দাঁড়াতে।

অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয় তারা।

তবে পথটা সহজ ছিল না।বিভাবরীর পরিবার কখনোই এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি।

তাদের মতে, পার্থ ছিল বিভাবরীর অযোগ্য।

বিভাবরী ছিল ধনী পরিবারের আদরের মেয়ে, সুন্দরী, শিক্ষিতা, গুণবতী।

অন্যদিকে পার্থ ছিল সাধারণ এক চাকরিজীবী।

বিভাবরীর বাবা-মা বহু চেষ্টা করেছিলেন মেয়েকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু বিভাবরী নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিল।

শেষ পর্যন্ত মেয়ের জেদের কাছেই হার মানতে হয়েছিল সবাইকে। বিয়ের পর বিভাবরী এই বাড়িতে বউ হয়ে আসে। আর তারপর থেকেই যেন বাড়িটার চেহারা বদলে যেতে শুরু করে। আগে যেখানে নীরবতা আর একাকীত্ব বাস করত, সেখানে ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয় হাসি, আনন্দ আর ভালোবাসা।

বাড়ির প্রতিটি ঘর নিজের হাতে সাজিয়েছিল বিভাবরী।

বারান্দায় ফুলের টব রেখেছিল।

বাগানে নানারকম ফুলের গাছ লাগিয়েছিল।

এই যে কাঠগোলাপ গাছটা দেখছেন—

ভদ্রলোক হাত তুলে গাছটার দিকে ইশারা করলেন।

— "এটাও বিভাবরীর নিজের হাতে লাগানো।"

অলোক চুপচাপ শুনছিল।

লোকটির কণ্ঠে এমন এক আবেগ ছিল, যেন প্রতিটি দৃশ্য তিনি নিজের চোখে দেখেছেন।

ভদ্রলোক আবার বলতে শুরু করলেন—

— "বাড়িটা বদলেছিল, পার্থও বদলেছিল, সে মানুষের সঙ্গে মিশতে শিখেছিল, হাসতে শিখেছিল।

জীবনকে উপভোগ করতে শিখেছিল।

বিকেলে দুজনে এই বাগানে হাঁটত, বর্ষার দিনে ভিজত।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় উপরের বারান্দায় বসে চা খেত।

পূর্ণিমার রাতে ছাদে উঠে জ্যোৎস্না দেখত।

পার্থ বিশ্বাসই করতে পারত না, তার মতো মানুষের জীবনেও এত সুখ আসতে পারে।

মনে হতো, ঈশ্বর যেন হঠাৎ করেই তার ভাগ্যের খাতা বদলে দিয়েছেন।

কিন্তু সুখ সব মানুষের কপালে দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

আর কখনো কখনো মানুষ নিজেই নিজের সুখের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে ওঠে..."

এখানে এসে ভদ্রলোক থামলেন।

তাঁর চোখে তখন এমন এক বিষাদ, যা অলোককে অস্বস্তিতে ফেলে দিল।

বাতাসে কাঠগোলাপের গন্ধ আরও ঘন হয়ে উঠেছে।

আকাশে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসছে।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বলতে শুরু করলেন ভদ্রলোক।

— "সুখী মানুষদের দেখলে কিছু মানুষের সহ্য হয় না। তারা নিজেরা সুখী হতে পারে না, অন্যকেও সুখে থাকতে দিতে চায় না।

পার্থ আর বিভাবরীর জীবনেও এমন কিছু মানুষ ছিল।

পার্থর কিছু আত্মীয়স্বজন আর তথাকথিত বন্ধু ছিল, যারা বাইরে থেকে শুভাকাঙ্ক্ষী সেজে থাকলেও ভিতরে ভিতরে ওদের সম্পর্কটাকে মেনে নিতে পারেনি।

কেউ বিভাবরীর সৌন্দর্যে ঈর্ষান্বিত ছিল, কেউ আবার পার্থর ভাগ্যকে।

তারা ধীরে ধীরে পার্থর কানে বিষ ঢালতে শুরু করল।

‘তোমার মতো সাধারণ একজন মানুষকে বিভাবরী সত্যিই ভালোবাসে?’

‘ওর মতো মেয়েকে অনেক ধনী, সুন্দর, প্রতিষ্ঠিত পুরুষ চেয়েছিল।’

‘বিয়ের আগে কত ছেলের সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব ছিল জানো?’

‘অনিন্দ্যকে কি ভুলে গেছ?’

প্রথম দিকে এসব কথা পাত্তা দিত না পার্থ।

কিন্তু বিষ যেমন ধীরে ধীরে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি সন্দেহও ধীরে ধীরে মানুষের মনকে গ্রাস করে।

পার্থর মধ্যেও তা-ই হলো।

বিভাবরীকে সে ভীষণ ভালোবাসত- আর সেই ভালোবাসা থেকেই জন্ম নিল ভয়, ভয় থেকে অনিরাপত্তা।

আর অনিরাপত্তা থেকে সন্দেহ।

বিশেষ করে অনিন্দ্যকে নিয়ে।

অনিন্দ্য ছিল বিভাবরীর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু।

একসময় বিভাবরীকে ভালোবাসতও।

যদিও বিভাবরী কখনো তাকে সে অর্থে ভাবেনি।বিয়ের পর অনিন্দ্য দূরত্ব বজায় রেখেছিল।

কিন্তু পার্থর মনে তার নামটা কাঁটার মতো বিঁধে ছিল।

দিন যেতে থাকল। পার্থর আচরণও বদলাতে শুরু করল।আগের মতো সহজে হাসত না, অকারণে রেগে যেত।

কখনো কখনো এমন প্রশ্ন করত, যার কোনো অর্থই ছিল না।

বিভাবরী প্রথমে ভেবেছিল অফিসের চাপ।

পরে বুঝল ব্যাপারটা তার চেয়েও গভীর।তবু সে ধৈর্য হারায়নি।ভালোবাসা দিয়ে, যত্ন দিয়ে, বোঝানোর চেষ্টা করেছে।

কিন্তু সন্দেহ একবার মানুষের মনে বাসা বাঁধলে যুক্তির ভাষা আর সেখানে পৌঁছায় না।

ক্রমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকে।

পার্থ প্রায়ই বিভাবরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করত।

কোথায় গিয়েছিল?

কার সঙ্গে কথা বলেছিলে?

কেন কথা বলছে?

প্রথম দিকে বিভাবরী কষ্ট পেলেও চুপ করে থাকত।

সে জানত, পার্থ খারাপ মানুষ নয়।

সে শুধু নিজের ভয় আর সন্দেহের কাছে হার মানছে।

কিন্তু প্রতিদিনের অপমান, অবিশ্বাস আর অকারণ অভিযোগ ধীরে ধীরে তার মনেও ক্ষত তৈরি করতে থাকে।

তবুও সে কাউকে কিছু বলেনি।

নিজের পরিবারকেও না।

সে চায়নি মানুষ পার্থকে ভুল বুঝুক। কারণ সে এখনও পার্থকে ভালোবাসত। অন্ধের মতো ভালোবাসত।

সেদিন বিকেলেও সে ভালোবাসত।

যে বিকেলটা ওদের জীবনের শেষ সুখের বিকেল হয়ে থাকবে।

ভদ্রলোক থামলেন।

গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তাঁর বুক থেকে।

অলোকের মনে হচ্ছিল, চারপাশের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠছে।

কাঠগোলাপের কয়েকটি ফুল ঝরে পড়ল মাটিতে।

ভদ্রলোক আবার বলতে শুরু করলেন—

— "সেদিন পার্থ অফিস থেকে ফিরছিল।

মেজাজ আগেই খারাপ ছিল।

গেটের কাছে এসে হঠাৎ তার দেখা হয় অনিন্দ্যের সঙ্গে।

অনিন্দ্য তখন বাড়ি থেকে বের হচ্ছিল।

আসলে বিভাবরীর সঙ্গে তার দেখা করতে আসার বিশেষ কারণ ছিল।

কিন্তু সেই কারণ জানার আগেই পার্থর চোখে আগুন জ্বলে ওঠে।

অনিন্দ্যকে দেখে তার মনে হলো, এতদিনের সব সন্দেহ যেন সত্যি হয়ে গেছে।

তবুও বাইরে থেকে নিজেকে শান্ত রাখল।

হাসিমুখেই অনিন্দ্যকে বিদায় দিল।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে তখন আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছে।

বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই সে দেখে—

বিভাবরী অপেক্ষা করছে।

হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি পরা।মুখে লাজুক হাসি।

চোখে একরাশ আনন্দ।আজ সে পার্থকে একটা বিশেষ খবর দিতে চেয়েছিল।কিন্তু পার্থ সেই হাসির অর্থ বুঝতে পারেনি।

বরং মনে করল, অনিন্দ্যের জন্যই সে এভাবে সেজেছে।

সেই ভুল ধারণাই সবকিছু ধ্বংস করে দিল।

প্রথমে কথা কাটাকাটি।

তারপর তর্ক।

তারপর অভিযোগ।

তারপর অপমান।

আর তারপর...

ভালোবাসার জায়গা জুড়ে নিল অন্ধ ক্রোধ।"

ভদ্রলোকের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চারপাশে আধো অন্ধকার। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে।

অলোক অদ্ভুত এক অস্বস্তি অনুভব করছিল।

ভদ্রলোক ধীরে ধীরে আবার বলতে শুরু করলেন—

— "সেদিন বিভাবরীও আর চুপ করে থাকেনি।

অনেক দিন ধরে সে পার্থর সন্দেহ, অপমান আর অবিশ্বাস সহ্য করে আসছিল।

কিন্তু সেদিন তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়।

পার্থ যখন বারবার অনিন্দ্যের নাম টেনে অপমান করতে থাকে, বিভাবরীও রাগে ফেটে পড়ে।

সে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছিল যে পার্থ ভুল ভাবছে। কিন্তু তখন পার্থ আর শুনতে পারছিল না।

মানুষ যখন ক্রোধে অন্ধ হয়ে যায়, তখন সে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে পারে না।

পার্থও পারেনি।

বিতর্ক ক্রমশ তীব্র হতে থাকে।

একসময় বিভাবরী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে ওঠে—

— 'আজও তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারলে না, পার্থ? এত বছর একসঙ্গে থাকার পরেও না?'

কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না পার্থ।

তার চোখে তখন শুধু রাগ।

অন্ধ, ভয়ংকর, ধ্বংসাত্মক রাগ।

এক মুহূর্তের উন্মত্ততায় সে বিভাবরীর গলা চেপে ধরে।

প্রথমে বিভাবরী বিশ্বাসই করতে পারেনি কী ঘটছে।

সে পার্থর হাত সরানোর চেষ্টা করে।

বারবার বলে—

— 'পার্থ... ছাড়ো... কষ্ট হচ্ছে...'

কিন্তু পার্থ তখন নিজের মধ্যে ছিল না।

যেন তার ভেতরের সমস্ত অন্ধকার তাকে গ্রাস করে ফেলেছিল।

ধীরে ধীরে বিভাবরীর হাতের শক্তি কমে আসে।

চোখের আলো নিভে যেতে থাকে।

আর একসময়...

সবকিছু থেমে যায়।

নিঃশব্দ।

নিস্তব্ধ।

ভয়ংকর এক নিস্তব্ধতা।

পার্থর হাতের মধ্যে নিথর হয়ে পড়ে থাকে বিভাবরী।

..."

ভদ্রলোকের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো।

অলোক নিঃশব্দে বসে রইল।

কিছু কিছু গল্পের বেদনা ভাষার চেয়েও বড় হয়ে যায়।

কিছুক্ষণ পরে ভদ্রলোক আবার বললেন—

— "বিভাবরীর নিথর দেহটা মাটিতে পড়ে যেতেই পার্থর হুঁশ ফিরে আসে।

সে বুঝতে পারে কী ভয়াবহ অপরাধ করে ফেলেছে।

সে পাগলের মতো বিভাবরীকে ডাকতে থাকে।

বারবার ঝাঁকাতে থাকে।

ক্ষমা চাইতে থাকে।

কাঁদতে থাকে।

তার মুখে, কপালে, চোখে অসংখ্য চুমু খেতে থাকে।

কিন্তু বিভাবরী আর সাড়া দেয় না।

যে মেয়েটা কিছুক্ষণ আগেও প্রাণভরে হাসছিল, সে তখন সম্পূর্ণ নীরব।

চিরতরে।

পার্থ বিভাবরীর দেহ বুকে জড়িয়ে মেঝেতে বসে কাঁদছিল।

ঠিক তখনই তার চোখ পড়ে টেবিলের উপর রাখা একটি খামের দিকে।

সেখানে ছিল একটি মেডিকেল রিপোর্ট।

বিভাবরী সেদিন তাকে যে সুখবরটি দিতে চেয়েছিল, সেটাই ছিল সেই রিপোর্টে।

কাঁপতে কাঁপতে কাগজটা খুলে পড়ে পার্থ।

আর তারপর...

তার পৃথিবী দ্বিতীয়বারের মতো ধ্বংস হয়ে যায়।

বিভাবরী মা হতে চলেছিল।

পার্থ বাবা হতে চলেছিল।

তাদের ভালোবাসার একটি নতুন প্রাণ পৃথিবীতে আসতে চলেছিল।

আর নিজের হাতে সে শুধু বিভাবরীকেই নয়—

নিজের অনাগত সন্তানকেও হত্যা করেছে।"

অলোকের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

ভদ্রলোকের চোখদুটো তখন অন্ধকারের মধ্যেও অদ্ভুতভাবে জ্বলজ্বল করছে।

— "সেদিন পার্থ বুঝেছিল, মানুষ কখনো কখনো নিজের সবচেয়ে বড় শত্রু নিজেই।

এক মুহূর্তের রাগ তার সমস্ত জীবন কেড়ে নিয়েছিল।

ভালোবাসা কেড়ে নিয়েছিল।

ভবিষ্যৎ কেড়ে নিয়েছিল।

স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছিল।

সবকিছু।"

ভদ্রলোকের গলা কেঁপে উঠল।

— "এরপর আর বেঁচে থাকার কোনো কারণ খুঁজে পায়নি পার্থ।

বিভাবরীর নিথর দেহটা বুকে জড়িয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল সে।

তারপর...

নিজের হাতের শিরা কেটে দেয়।

ধীরে ধীরে রক্তে ভেসে যায় ঘরটা।

শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিভাবরীকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে রেখেছিল সে।

হয়তো মৃত্যুর আগে একটাই প্রার্থনা করেছিল—

আরেকবার যদি ক্ষমা পাওয়া যেত..."

ভদ্রলোক চুপ করে গেলেন।

চারপাশে তখন শুধু রাতের নীরবতা।

অলোকের বুকের ভেতরটাও ভারী হয়ে আছে।

কত ভালোবাসা, কত স্বপ্ন, কত সুখ—

সব শেষ হয়ে গেল একটি মুহূর্তের ক্রোধে।

ভদ্রলোক বাড়িটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন—

— "পার্থর মতো মানুষরা বড় বোকা ছিলেন বুঝলেন?

যখন ভালোবাসা কাছে থাকে, তখন তার মূল্য বোঝে না।

আর যখন বোঝে, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়।"

অলোক কিছু বলতে পারল না। ওর মনে কিছু প্রশ্ন ভীর করে।

আলোক প্রশ্ন করে,

“আপনি এত কিছু জানলেন কীভাবে? আর আপনার নামটাই তো জানা হলো না…”

কথাটি শেষ করেই সে ভদ্রলোকের দিকে তাকায়। কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখে বিস্ময় জমে ওঠে। সেখানে আর কেউ নেই—যেখানে ভদ্রলোক বসে ছিল, সেখানে এখন শূন্যতা। যেন কেউ কখনো ছিলই না।

আলোক ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। অদ্ভুত এক শীতলতা গায়ে ছুঁয়ে যায় তার। তার দৃষ্টি আপনাতেই বাড়ির দিকে চলে যায়।

ঠিক তখনই তার চোখে ধরা পড়ে বারান্দা।

মনে হয়, হালকা গোলাপি শাড়ি পরা এক নারী সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। চুল যেন হাওয়ায় এলোমেলো, চোখ দুটো গভীর বিষাদে ভরা। মুখে কোনো অভিযোগ নেই—শুধু নিঃশব্দ অভিমান, দীর্ঘদিনের জমে থাকা এক নীরব কান্না।

আলোক পলক ফেলতেই সেই দৃশ্য মিলিয়ে যায়। বারান্দা আবার শূন্য, নিস্তব্ধ।

কিছুক্ষণ সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। দিনের আলো মিলিয়ে আসতে শুরু করে। অলোক বাড়ির পথে পা বাড়ায়।

সময় এগিয়ে চলে।

কিছুদিন পর আলোক বাড়িটি কিনে নেয়।

কয়েক মাসের মধ্যে পরিবারসহ তারা নতুন বাড়িতে উঠে আসে। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার পরও বাড়িটি এখন নতুন করে সাজানো—দেয়ালে রং, বারান্দায় আলো, উঠানে পরিচ্ছন্নতার ছাপ। সুনিতা খুব খুশি, নতুন বাড়ি নিয়ে তার উচ্ছ্বাসের শেষ নেই।

একদিন স্টোররুম পরিষ্কার করতে গিয়ে সুনিতা একটি পুরনো, ধুলো জমা ছবি খুঁজে পায়।

সে ছবিটি হাতে নিয়ে ঘরে এসে বলে,

“এই দেখো তো, কী সুন্দর পুরনো ছবি পেলাম। মনে হয় আগের মালিকদের।”

আলোক ছবিটি হাতে নেয়।

এক মুহূর্তেই তার মুখের রং বদলে যায়।

ছবিতে এক নবদম্পতি—একজন পুরুষ ও একজন নারী। পুরুষটির মুখে গাম্ভীর্য, চোখে অদ্ভুত এক নীরবতা; নারীর মুখে কোমল হাসি, যেন আলোয় ভরা এক জীবন।

আলোক চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। ধীরে ধীরে তার বুকের ভেতর শীতল স্রোত বয়ে যায়। কারণ এই মুখ সে চিনে ফেলেছে।

এই সেই ভদ্রলোক—যিনি তাকে গল্প বলেছিলেন।

আর নারীর মুখ… সেই বিষণ্ন শাড়ি পরা ছায়ামূর্তির মতোই।

ছবির পিছনে কালো কালি দিয়ে লেখা—

“পার্থ + বিভাবরী”

আলোকের আর বুঝতে বাকি থাকে না।

সেদিন যে লোকটি তাকে বাড়ির ইতিহাস শুনিয়েছিল, সে আর কেউ নয়—পার্থ নিজেই। নিজের অতীত, নিজের বিষাদময় জীবন, আত্মগ্লানি —সব নিয়ে আজও সে এ জগতে ঘুরে ফিরছে।

আর বিভাবরী… হয়তো এখনো এই বাড়ির প্রতিটি ইটে, প্রতিটি বাতাসে মিশে আছে তার অসমাপ্ত ভালোবাসা, অপূর্ণ জীবন আর নীরব অভিমান।

আলোক ধীরে ধীরে ছবিটি নামিয়ে রাখে।

বাড়ির ভেতর হালকা বাতাস বয়ে যায়, যেন কারও দীর্ঘশ্বাস ছুঁয়ে গেল পুরো ঘরটাকে।

সে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। নীরবে দুজন দু:খী আত্মার শান্তি কামনা করে।


— End —

About the Author

Tasnia Khan