Editorial Editorial

নগ্নতা, মাতৃত্ব ও শরীর-ভীতি: যৌনতার বাইরে নারীর প্রাক-সামাজিক ও প্রাকৃতিক অস্তিত্বের পাঠ

Genre / Keywords Existentialism Gender Feminist Protest
নগ্নতা, মাতৃত্ব ও শরীর-ভীতি: যৌনতার বাইরে নারীর প্রাক-সামাজিক ও প্রাকৃতিক অস্তিত্বের পাঠ

১৯৫৯ সালে মার্কিন এক্সপেরিমেন্টাল চলচ্চিত্রকার স্ট্যান ব্র্যাখাজ (Stan Brakhage) তার স্ত্রী জেন ব্র্যাখাজের গর্ভধারণ এবং প্রথম সন্তান জন্মদানের অবিকৃত দৃশ্য নিয়ে তৈরি করেছিলেন কালজয়ী স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘Window Water Baby Moving’। চলচ্চিত্রে মাতৃত্ব, শারীরিক প্রসববেদনা ও প্রজনন প্রক্রিয়ার এই নগ্ন রূপায়ণ তৎকালীন সমাজে বিপুল বিতর্ক ও আইনি বাধার সৃষ্টি করেছিল। হাসপাতালের শীতল, জীবাণুমুক্ত ও চিকিৎসাকৈন্দিক ক্লিনিক্যাল দেয়ালের বাইরে মানবজীবনের সবচেয়ে প্রারম্ভিক ও প্রাকৃতিক এই ঘটনাকে শিল্পের আলোয় অবিকৃতভাবে উপস্থাপন করার কারণে তৎকালীন সামাজিক ট্যাবু একে ‘অশ্লীল’ বা পর্নোগ্রাফিক বলে দাগিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ভিজ্যুয়াল কালচার ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ব্র্যাখাজের কাজটিকে আজও দেখা হয় মানবদেহের আদিম সৌন্দর্য, জীবন সৃষ্টি, প্রাক-সামাজিক শারীরিকতা এবং মাতৃত্বের এক গভীর নন্দনতাত্ত্বিক ও অবস্তুবাচক প্রকাশ হিসেবে।

আজকের একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ও ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়েও যখন মানবশরীরের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া বিশেষ করে সন্তান প্রসবের মতো পরম সৃষ্টির দৃশ্য মানুষকে অফেন্ডেড বা সংক্ষুব্ধ করে তোলে, তখন আমাদের বুঝতে হবে সংকটটি কোনো দৃশ্য বা প্রসবকালীন নগ্নতার নয়, সংকটটি মানব শরীরকে দেখার ও বিচার করার পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির (Social Gaze)।  

 

শরীর, যৌনতা ও নারীবাদী ফেনোমেনোলজি: দ্বৈততার সংকট

পিতৃতান্ত্রিক ও উপনিবেশিত সমাজ কাঠামোতে নারীর শরীরকে প্রধানত দুটি চরমবিন্দুতে ভাগ করে সংজ্ঞায়িত করা হয়। হয় সে ‘পবিত্র, কুমারী বা পূজনীয়’কোনো বিমূর্ত ধারণার প্রতীক (Madonna Complex), না হয় সে ‘ভোগের বস্তু বা যৌনতার অনুষঙ্গ’ (Whore Complex)। এই কৃত্রিম দ্বৈততার বাইরে নারীর যে নিজস্ব স্বায়ত্তশাসিত, বাস্তব ও রক্ত-মাংসের শরীর রয়েছে যার নিজস্ব ক্ষমতা, মেটাবলিজম, বেদনা ও প্রজনন প্রসেস রয়েছে তাকে সমাজ বা তার প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি মানতে ভয় পায়।

নারীর স্তন ও যৌনাঙ্গ (ভ্যাজাইনা) আধুনিক কমার্শিয়াল ও মিডিয়া কালচারে মূলত মেল-ফেটিশাইজেশন (male fetishization) বা যৌন বাসনা মেটানোর অঙ্গ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত ও পুনরুৎপাদিত হয়েছে। অথচ শারীরবৃত্তীয়, নৃতাত্ত্বিক ও বিবর্তনীয় দিক থেকে এই অঙ্গগুলোর প্রাথমিক ও মৌলিক কাজ মানব প্রজাতির বংশরক্ষা, সন্তান প্রসব এবং নতুন জীবনকে পুষ্টি প্রদান করা। যখন সন্তান জন্মদানের মতো একটি মহৎ, কষ্টসাধ্য ও পরম জৈবিক প্রক্রিয়ার দৃশ্য দেখে কোনো সমাজ বা প্রতিষ্ঠান সংক্ষুব্ধ বা ‘অফেন্ডেড’ হয়, তখন তা আসলে ঐ দৃশ্যের নগ্নতার অপরাধ নয়, তা নির্দেশ করে দর্শকের সেই বিকৃত সামাজিক স্টিগমা ও মেল-গেইজকে, যা প্রসবকালীন ভ্যাজাইনা কিংবা দুগ্ধদানের স্তনের অবিকৃত কাজের মধ্যেও কেবল ‘যৌনতা ছাড়া আর কিছুই আবিষ্কার করতে পারে না।

 

ভিজ্যুয়াল ট্যাবু, মেল গেইজ এবং শরীরের স্বাধিকার

চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি তত্ত্ববিদ লরা মালভির (Laura Mulvey) ‘মেল গেইজ’ বা পুরুষতান্ত্রিক দৃশ্য-তত্ত্ব অনুযায়ী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গণমাধ্যম নারীকে তখনই দেখতে পছন্দ করে, যখন নারী পুরুষ-দর্শকের আনন্দ, ফ্যান্টাসি বা ভোগ লালসার পরোক্ষ অবজেক্ট হয়। কিন্তু সন্তান প্রসবের সময় নারীর শরীর যে চরম শারীরিক শক্তি, রূপান্তর, যন্ত্রণা এবং সৃষ্টির ক্ষমতার মধ্য দিয়ে যায়, সেখানে কোনো ‘যৌন আবেদন’ বা কৃত্রিম শ্লীলতার সুযোগ থাকে না, সেখানে থাকে অবিনশ্বর মানব অস্তিত্বের এক চূড়ান্ত সংগ্রাম। লরা মালভির তত্ত্বমতে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর শরীরকে কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য মনে করে যখন তা পুরুষালি দৃষ্টির নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু সন্তান প্রসবের সময় নারীর যে অদম্য, আত্মনিয়ন্ত্রিত ও ক্ষমতাময় শারীরিক রূপ প্রকাশ পায়, তা পুরুষতান্ত্রিক ভোগবাদী দৃষ্টিকে অকার্যকর করে দেয়।

যে সমাজ ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন বা বিনোদনের নামে নারীর শরীরের মেল-কনজাম্পশন (Male Consumption) দেখে অভ্যস্ত ও কমফোর্টেবল, সেই সমাজই যখন বাস্তব সন্তান জন্মদানের অলৌকিক ও রক্তাক্ত শারীরিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, তখন তারা নৈতিক অস্বস্তিতে পড়ে। কারণ প্রসবের এই অবিকৃত বাস্তবতা নারীর শরীরকে কারো ভোগের ‘অবজেক্ট’ হিসেবে নয়, বরং এক স্বায়ত্তশাসিত, শক্তিশালী ও পরাক্রমশালী জীবন্ত ‘সাবজেক্ট’ (Subject) হিসেবে হাজির করে। প্রসবকালীন এই শারীরিক প্রকাশ কোনো যৌন প্রদর্শন নয়, তা হলো মানব প্রকৃতির সবচেয়ে অবিকৃত রূপ।

 

মেডিকেল ইনস্টিটিউশন, মাতৃত্বের ট্যাবুকরণ এবং কৃত্রিম ‘শালীনতা’

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর (Michel Foucault) ক্ষমতার তত্ত্বের আলোয় বিচার করলে দেখা যায়, সমাজ কীভাবে মানুষের শরীরকে, বিশেষ করে নারীর শরীরকে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণের (Biopower) অধীনে রাখতে চায়। মাতৃত্বকে আমরা মুখে ‘মহিমান্বিত’ বলি, কিন্তু মাতৃত্বের মূল ভিত্তি যে প্রসব বেদনা, রক্ত ও তীব্র শারীরিক রূপান্তর তাকে আমরা মেক-আপ বা শ্লীলতার পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখতে চাই। এটি এক সামাজিক ভণ্ডামি।

সন্তান জন্মদান কেবল হাসপাতালের চার দেয়ালের ভেতরের কোনো গোপন, লজ্জাজনক বা কেবল চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিষয় নয়, তা মানবজাতির প্রজনন ও সভ্যতার ধারাবাহিকতার মূল উদযাপিত ঘটনা। শরীরকে কেবল যৌনতার চশমায় আবদ্ধ করে দেখার এই মানসিক অক্ষমতাই মূলত সব ট্যাবুর উৎস। শরীর কোনো অপরাধ নয়, প্রসবকালীন ভ্যাজাইনা বা স্তন কোনো অবমাননাকর বা কুরুচিপূর্ণ বিষয় নয় তা এক নতুন জীবনের আগমনদ্বার। একে অশালীনতা বা পর্নোগ্রাফির চোখে দেখাটা কোনো সুস্থ মূল্যবোধের পরিচয় নয়, বরং তা এক গভীর মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অসুস্থতার লক্ষণ।

 

উপসংহার: বিজ্ঞান, শিল্প ও চিন্তার মুক্তি

বিজ্ঞান, নন্দনতত্ত্ব ও মুক্ত চিন্তার যুগে শরীরের স্বাভাবিক ও প্রাক-সামাজিক জৈবিক প্রক্রিয়াকে অশালীন বা আপত্তিকর মনে করা প্রগতির বিপরীতমুখী চিন্তা। স্ট্যান ব্র্যাখাজ তার ক্যামেরার মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন জীবনের প্রারম্ভিক নগ্নতার ভেতরের প্রাক-আধুনিক নন্দনতত্ত্ব ও পবিত্রতা। জ্ঞানচর্চার ও শিল্পভাবনার প্রধান দায়িত্বই হলো সমাজকে তার নিজস্ব অন্ধত্ব, মেকি নৈতিকতা ও ট্যাবুর মুখোমুখি দাঁড় করানো।

সন্তান জন্মদানের মতো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে নির্মোহ ও বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারাটাই একটি প্রাপ্তবয়স্ক, উদার ও সুস্থ সামাজিক মনস্তত্ত্বের পরিচয়। যতক্ষণ না আমরা নারীর শরীরকে কেবল ‘যৌন অনুষঙ্গ’ হিসেবে দেখার এই লিঙ্গভিত্তিক স্টিগমা থেকে বের হতে পারছি, ততক্ষণ মাতৃত্বের প্রতি সমাজের বাহ্যিক সম্মান প্রদর্শন কেবলই এক ফাঁপা ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়। শরীরের ট্যাবু ভেঙে জীবনের মৌলিক, বাস্তব ও প্রাকৃতিক সত্যকে সহজভাবে গ্রহণ করাই হোক আমাদের সাংস্কৃতিক প্রগতি।

 

তাত্ত্বিক সূত্র ও নির্দেশিকা

Brakhage, Stan (1959): Window Water Baby Moving (Film) – প্রসবকালীন দৃশ্য রূপায়ণ ও প্রাক-সামাজিক শারীরিক নান্দনিকতা।

Mulvey, Laura (1975): Visual and Other Pleasures – Male Gaze (পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টি) ও ভিজ্যুয়াল কালচারের কনজাম্পশন রাজনীতি।

Foucault, Michel (1976): The History of Sexuality – Biopower, প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা এবং শরীরের ওপর ক্ষমতা চর্চা।



— End —