Novel

অধ্যায়-৪: সুবিচার

Excerpt

কিছু না ভেবে হঠাৎ আমি টিভি দেখা শুরু করলাম। তা শুধু বিজ্ঞাপন। তাই দেখতে লাগলাম। দেখলাম এক সড়ক দূর্ঘটানার পঞ্চাশজন মৃতের জন্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করেছেন। হঠাৎ মনে হল, এখানে কি যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগের কিছু থাকতে পারতো! তখন কলিংবেল বেজে উঠলো। তা আমার ভালই লাগলো। কেউ আসুক, ছুটির দিন একা আজকে বিরক্ত লাগছে। দরজা খুলে দেখি বাড়িওলা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে। হেসে ভিতরে আসতে বললাম। এমন যে বাসায় ফুল থাকলে তা দিয়েই অভ্যর্থনা জানাতাম।

Genre / Keywords Existentialism Stream of Consciousness Absurdism
Sham Pulok —
অধ্যায়-৪: সুবিচার

সুবিচার

 

হঠাৎ করেই অদ্ভুত কিছু ঘটে গেল। অদ্ভুত এ কারনে যে, হঠাৎ এ পরিবর্তন অন্তত আমি চাইনি। আমি যে এক সময় বিকেলে হাঁটতে যেতাম বা রাতে, মাঝরাত অবধি হাঁটতাম, হঠাৎ ছেড়ে দিলাম। অফিস থেকে সোজা বাসায় চলে আসতে শুরু করলাম। এমনকি কাদেরের দোকানে চা খেতেও যেতাম না। বাসায় এসে নিজের হাতে চা বানিয়ে খেতে শুরু করলাম। তারপর বসে বসে টিভি দেখা শুরু করলাম। আজকাল খুব মন দিয়ে ঝুমার অভিনয় দেখি। নাটকগুলি বা টেলিফিল্ম যদিও তেমন ভাল লাগে না, তবুও চাই ভাল লাগুক। যদিও যেই দৃশ্যে ঝুমা থাকে না সে দৃশ্যে আমার কোন আগ্রহ নেই।

সপ্তাহে অন্তত একদিন ঝুমা বাসায় আসতে লাগলো। মাঝে মাঝে বেশিও। নিয়িমিত ফোন দেয়। মাঝে মাঝে আমিও দেই। এসে সে আমার জন্য রান্নাও করে। মাঝে মাঝে আমরা বাইরেও খেতে যাই। তবে কেনাকাটা করতে যাওয়া হয়নি। সে নিজেই আমার জন্য কিনে নিয়ে আসে। কেন এটা করে আমি জানি না। তবে এত আনন্দের মধ্যেও পাপিয়া মেয়েটাকে মনে পড়তো। কিন্তু তার কোন খবর আমার কাছে নেই। সেই দিনের পর আর আসেনি। কোন খবর দেয়নি, নেয়নিও। আমার সাথে দেখাও হয়নি। এর কারণ হয়তো আমি আর এখন হাঁটতে যাই না। সেকি আমার এই আনন্দের দিনের কথা শুনেছে। কোনভাবে জেনেছে? এজন্য আর আসে না? নাকি তার জীবনে কিছু ঘটে গেছে! তবে সেটা নিয়ে আমি তেমন মাথা ঘামাই না। মানুষের জীবনে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। তার মধ্যে অনেককিছুই ভয়ংকর।

আমার ইচ্ছে হচ্ছিলো মাকে এই বিষয়টা বলি। কিন্তু কীভাবে বলবো তা বুঝতে পারছিলাম না। তবে একটা বিষয় ভেবে নিজের মধ্যে তেমন তাড়া অনুভব করছি না। কারন এখনই তো আর বিয়ে করছি না। ধীরে সুস্থে বললেই হলো। কিন্তু মা নিজেই একদিন ঝুমার কথা তুললো। জিজ্ঞাসা করলো সেদিনের কথা মনে আছে কিনা। হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন করলো তা বুঝলাম না। যদিও মা আসলে আমি একদমই টিভি দেখি না। অবশ্য মা নিজে দেখে। তখন আমি বই পড়ি। মাকে দেখি প্রায়ই তিনি খুব হাসছেন নাটক দেখে। আবার কাঁদতেও দেখি। তবে এটা আশ্চর্যের বিষয় তিনি এ দেশীয় নাটকগুলোই দেখেন। এর কারণ অবশ্য আমি বের করতে পারিনি। অবশ্য এ বিষয় নিয়ে খুব একটা ভেবেছি বলে মনে পড়ে না।

মায়ের প্রশ্ন শুনে কিছু না বলে আমি শুধু হাসলাম। মা হেসে বললেন, এখন কিন্তু মেয়েটা অনেক সুন্দরী হয়ে উঠেছে!

মায়ের কথা শুনে মনে হল তার খুব গর্ব হচ্ছে। আমার একবার ইচ্ছে হল তাকে বলি তুমি চাইলে ও এসে তোমার পায়ে সালাম করবে। কিন্তু কিছু বললাম না। শেষে অদ্ভুত অভিমানের সুরে, মায়ের কাছে যা বালকের বুলির মতই শোনালো, বললাম, তোমরাই তো মেরে বাড়ি থেকে বের করে দিলে। তাই ভুলে গেছি।

আমার কথা শুনে মায়ের বোধহয় কষ্ট হল। আমার হাতদুটি নিজের হাতে নিয়ে আমার দিকে তাকালেন। মুখে একদমই হাসি নেই। আমি হঠাৎ হেসে উঠলাম। অনেকটা উচ্চস্বরেই। এমন ভাব যে মাকে খুব বোকা বানিয়েছি। মা হেসে দিলেন। তবে হাত ধরেই আছে। বললেন, তুই ওর সাথে যোগাযোগ করেছিস?

এই প্রশ্ন শুনে আমার ইচ্ছে হল মাকে সব বলেই ফেলি। কিন্তু ভাবলাম, নাহ! না বলাই ভালো। শেষে বললাম, তুমি যদি চাও তাহলে যোগাযোগ করবো।

আমার উত্তরে মা বেশিই খুশি হল। ভাবলাম অন্য উত্তর দিলে হয়তো এত খুশি হত না। তাছাড়া এখন ঐ বিষয়টা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। হঠাৎ মনে হল, পরে যদি মা জেনে যায়? কিন্তু আমার মনে হল না তাতে মা অখুশি হবে। মনে হল তাতে আরও বেশিই খুশি হবে। মা বললেন, আমি যদি পারতাম সেই ছেলেবেলায়ই তোদের বিয়েটা কথা পাকা করে রাখতাম। কিন্তু তোর বাবা এমন রাগ হল তোর ঐ ব্যাপারে বলতেই সাহস পেলাম না। পরে অনেক ভেবেছি। কিন্তু কীভাবে বলবো ভাবতেই পারিনি। তুই তোর কাজ নিয়ে এতো ব্যস্ত থাকিস!

মায়ের কথায় আমি খুব মজা পেলাম। অনেকটা ছেলেমানুষি ভঙ্গীতেই বললাম, তুমি তখনো কিশোরী ছিলে তাই না!

আমার কথায় মা লজ্জা পেল বোধ হয়। হাসতে লাগলো। আমার জানা মতে মায়ের বিয়ে হয়েছিল খুব অল্প বয়সেই। তা পনেরোর বেশি তো হবেই না। তাই হয়তো পুতুল বিয়ের একটি সাধ তার সারাজীবন ধরে রয়ে গেছে। নিজের প্রতি অভিযোগ করলাম, এতদিন বুঝিনি কেন? তাহলে হয়তো আরো আগেই মায়ের জন্য একটি বউ এনে দিতাম। তবে এ নিয়ে তেমন ভাবতে পারলাম না। মা বললেন, তুই ওর সাথে কথা বলিস। দরকার হলে আমি ওর পরিবারের সাথে কথা বলবো।

মাকে আমি বলেই ফেললাম, মা, এখন ছেলেমেয়েরা আর পিতামাতার পুতুলের মতে বিয়ে করে না। ওর বাবা মা বললেই কি ও আমাকে বিয়ে করবে? ওর একটি স্বাধীনতা আছে না!

মাকে দেখলাম একটু চিন্তা করলো। তারপর বললো, তাও ঠিক। এরপর চুপ হয়ে গেলেন। দেখে মনে হল তার আশা ভঙ্গ হয়েছে। বললেন, তারপরও তুই কথা বলে দেখিস। অন্তত চেষ্টা করিস।

আমি কিছু বললাম না। হালকা হাসলাম। হাসি দিয়েই বুঝাতে চাইলাম, চেষ্টা করবো। যদিও ইচ্ছে হল সবকিছু বলে দেই। কিন্তু কেন যেন পারলাম না। এর কারণ কি নিজের মনের মধ্যে এখনো এক ধরণের অনিশ্চয়তা কাজ করছে! এ প্রশ্নেরও কোন উত্তর পেলাম না। অন্তত একটি সান্ত্বনাসূচক উত্তর হলেও খুশি হতাম।

একদিন ঝুমাকে মায়ের ব্যাপারটা বললাম। তা কয়েকদিন পর। সেদিনই ফোনে বলতে ইচ্ছে হয়েছিল কিন্তু তা বললাম না। তারপর একদিন বাসায় আসলো তখনও বললাম না। একদিন যখন রাতে ঘুরতে বের হলাম। সেদিন হঠাৎ বললাম। ব্যাপারটা শুনে ঝুমাকে খুব খুশি মনে হল। অনেকটা উচ্ছ্বসিতভাবেই ও মায়ের সাথে কথা বলতে চাইলো। বললো কালকেই সে মায়ের সাথে কথা বলবে।

ওর উচ্ছ্বাসে আমি খুব মজা পেলাম। মাকে আমি কি বলেছি তা বলতেই আমার ঘাড়ে একটি থাপ্পর মারলো। ‘তুমি সত্যি বললে না কেন?’ বলে উঠলো।

আমি হাসলাম। বললাম, মা ভাবতেই পারতো না হঠাৎ তোমার সাথে দেখা হয়েছে। তাছাড়া যখন মা বললো, তোমার সাথে যোগাযোগ করতে আমার মনে হলো সেটাই ভাল হবে।

আমার উত্তরে ঝুমা হাসতে লাগলো। বলে উঠলো, ‘তুমি পুরাই মায়ের দুষ্ট ছেলে।’ এ কথাটা আমার খুব পছন্দ হলো। কিছু না বলে হঠাৎ চুমু খেয়ে নিলাম। ভেবে দেখলাম এমন নয় আগে কিছু বলে চুমু খেতে হয়। প্রেমে পড়ার বিষয়টা একই। কিছু না বলেই প্রেমে পড়ে। হঠাৎ, ভয়ংকর রকমের হঠাৎ। কিন্তু এই ভয়ংকর ভাবলাম কেন তা বুঝতেই পারলাম না।

আমি ঝুমাকে বললাম, তুমি অন্তত আর কয়েকদিন পর মাকে ফোন দাও। তাকে আরও কিছুদিন ভাবতে দাও এ বিষয়টা নিয়ে। যেহেতু তিনি তোমাকে পছন্দ করেন। মনে কর মা কল্পনা করছেন, কোন না কোন ভাবে আমি তোমার ফোন নম্বর জোগাড় করেছি। তারপর বহুবার ফোন দিলাম কিন্তু তুমি ধরলে না। এমন হতে পারে তিনি ভাবছেন যে তুমি এক সময় হঠাৎ কলব্যাক করলে। অথবা ভাববে আমি বাধ্য হয়ে তোমার বাসায় চলে গিয়েছি। কিন্তু কেউ আমাকে ঢুকতেই দিল না। তখন রাতে যখন তুমি ফিরলে তখন আমার সাথে তোমার দেখা হয়ে গেল। তখনও আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। তুমি দেখেই চিনে ফেললে, এটা সেই বাদুর ছেলেটা না!

এ পর্যন্ত বলতেই ঝুমা আমাকে থামিয়ে দিল। ‘হইছে আর বলতে হবে না। মাকে নিয়ে এমন কেউ করে? আমি পারবো না। আমি কালই তাকে ফোন দিয়ে সব জানিয়ে দেব। এও বলে দেবো আমরা বিয়ে করবো বছরখানেক পর।’

বুঝলাম এই ব্যাপারে ওকে দমানো যাবে না। বললাম, ইচ্ছে হলে বলো। কিন্তু মা যখন বুঝতেন আমি তার ইচ্ছের কথা ভেবে অনেক চেষ্টায় তোমার সাথে দেখা করেছি। তখন তিনি বেশি খুশি হতেন।

আমার কথা শুনে ও বলে উঠলো, আমি এও বলে দেবো সেদিনের আগেই আমাদের কথা হয়েছে। তুমি ইচ্ছে করেই তাকে কিছু বলোনি।

এবার আমার খুব রাগ লাগলো। ইচ্ছে হলো এই বোকা মেয়েটাকে চড় বসিয়ে দেই, বা চুল টেনে ধরি। হঠাৎ আমি জোরে হেসে উঠলাম। আমি কি সব ভাবছি? আমি তো সেই বোকা কিশোরটি রয়ে গেছি। যে কিনা অদ্ভুত খেয়ালে সব চিন্তা করতো। পারপার্শ্বিকতা নিয়ে কিছুই ভাবতো না।

ঝুমা অবশ্য আমার সাথে হাসিতে যোগ দিল না। সে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে রইলো। সেকি আমার এই বোকাটে বুদ্ধিটা নিয়ে ভাবছে? এটা কি তাকে আমার কাছে থেকে দূরে ঠেলে দেবে? নাকি কাছে টেনে আনবে? আমি ভাবতে লাগলাম। তবে আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। অবশ্য ঝুমা আমার হাতদুটি তার হাতে নিয়ে আঙুল নিয়ে খেলেতে লাগলো। সেই পুরনো খেলা। একেবারে আদিম খেলার একটি। হয়তো ফারাও তার রানির আঙুল নিয়ে এমন খেলেছে, অথবা রানি ফারাওয়ের আঙুল নিয়ে।

ফেরার সময় কাদেরের দোকানে চা খেলাম। দোকানে আজ তেমন লোক নেই। এজন্যই অবশ্য গেলাম। হয়তো ক্রিকেট খেলা চলছে। যেহেতু ওর দোকানে টিভি নেই। তাই আজ ক্রেতাও নেই। ঝুমাকে বললাম, চলো তোমাকে ভাল এক কাপ চা খাওয়াই। কাদের আমাকে দেখে খুব খুশি। তাছাড়া ঝুমাকে চিনতে পেরেছে বলেই মনে হল। কিন্তু তেমন কিছু বললো না। চা খেতে খেতে আমি বললাম, কাদের, তোমাকে একটি টিভি কিনে দেবো ভাবছি। দোকানে কি তুমি চালাতে পারবে? তাহলে হয়তো খেলার দিনেও ক্রেতা থাকবে!

কাদের হেসে বললো, জায়গা তো কম। ছোটখাটো হলে হয়তো চালাতে পারবো। কিন্তু পুলিশ যে ঝামেলা করে। দেখা যাবে একদিন এসে ভেঙ্গে ফেললো!

তা ভাঙ্গুক। তুমি পাশের দোকান থেকে কারেন্ট নিয়ে নিতে পারো। তাহলে হয়তো তাদের তোমার টিভির উপর রাগ বাড়বে না। আর আসলেই ভাল এক কাপ চা দেবে। কেকও দিতে পারো। এ বলে মনে হলো খুব বুদ্ধিমানের মত কথা বললাম। কিন্তু দেখি ঝুমা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আর কাদের ঝুমার হাসি দেখছে।

এদের দেখে আমি চুপচাপ চা খেতে লাগলাম। তবে ভাবলাম, একটি টিভি কিনে দেবই। তা পুলিশ ভাঙুক। তবে মনে হল বিষয়টা ঝুমার ভালই লেগেছে। ফেরার সময় বললো, টিভিটা যদি আমি কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দেই! আমার ইচ্ছে বলি, আরে বোকা মেয়ে তুমি পাঠাবে কেন? আমিই কিনে দেবো। কিন্তু তা না বলে বললাম, এ নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমিই পাঠিয়ে দেবো।

ঝুমা কেন জানি আর কথা বাড়ালো না। ভেবে দেখলাম সে কথা বাড়ালেও আমার খারাপ লাগতো না। উত্তরটা আমি খুব ভালভাবেই গুছিয়ে ফেলেছিলাম। ও অন্য কথা তুললো। বললো, মাকে কিন্তু আমি কালই ফোন দেবো। এ বিষয় নিয়ে তোমাকে আর অদ্ভুতভাবে ভাবতে হবে না। দেখ, আমার সাথে কথা বলে মা খুশিই হবে।

মা যে খুব খুশি হবে এ বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই। তাই কিছু বললাম না। শুধু হাসলাম। হঠাৎ করে বলতে ইচ্ছে হল বলি, চাইলে তুমি এখনি কথা বলতে পারো। মা হয়তো এখনো টিভি দেখছেন। কিন্তু তা বললাম না। ওর কাল কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, তা কালই বলুক।

সময় খুব সুন্দর জিনিস। কারণ রাতটা খুব ভালোভাবেই কেটে গেল। এমন যদি হত রাতটা খুব খারাপভাবে কাটতো তাহলে কি মনে হত সময় খুব সুন্দর? আমি ঝুমার দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবতে লাগলাম। ওর মুখ দেখে মনে হচ্ছে এখনি জেগে উঠবে কিন্তু উঠছে না। এমন নয় যে আমি চাচ্ছি ও জেগে উঠুক। আমার উঠারও তাড়া নেই। যেহেতু আজ অফিস নেই। ভাবছি, যদি এমন হত আমি ধুমপান করতাম তাহলে এখন হয়তো বসে বসে সিগারেট ফুঁকতাম আর ঝুমার নিঃশ্বাসের উঠানামা দেখতাম। কিন্তু তা যেহেতু করি না, ভাবলাম শুয়ে শুয়ে পানি খাই।

হঠাৎ মনে হল, চা খাওয়া যেতে পারে। তাই উঠে পড়লাম। চায়ের পানি গরম হতেই ঝুমা জেগে উঠলো। দেখলো যখন চায়ের পানি দিয়েছি তখন চা বানালো। আমি বলতে পারতাম, তুমি কেন? আজ আমিই তোমার জন্য চা বানাই? কিন্তু তা বললাম না। তার পরিবর্তে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর চা বানানো দেখলাম।

সকালের নাস্তা করে ঝুমা চলে গেল। আমার ছুটি থাকলেও ওর নেই। দিন যত যাচ্ছে ততই সে বেশি ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। এর শেষ কোথায় আমি জানি না। তবে এ নিয়ে তেমন ভাবনা নেই। ব্যস্ততা ভাল। ব্যস্ততা মানুষের জীবনকে স্বাভাবিক করে দেয়। তবে এটা অবশ্যই দৈহিক ব্যস্ততা। মনের ব্যস্ততা খুব খারাপ। আর যারা দৈহিকভাবে ব্যস্ত থাকে না, তাদের মন ব্যস্ত থাকে। মনে হল, এ নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবা ঠিক হবে না। কেন ঠিক হবে না, এ নিয়ে ভাবতে চাইলাম না। কেন চাইলাম না, এর উত্তর সবাই জানে, আমিও। হঠাৎ মনে হল, এভাবে যদি কেন কেন বের করা শুরু করি, তবে তা কোনোদিন শেষ হবে না। তাই মনে হলো, যেটা শূন্য সেটাই অসীম। এটা যে কত হাস্যকর হাইপোথিসিস তা আমি না ভাবলেও সবাই ভাববে। তা ভাবুক। ভাবতে দোষ নাই। এমনকি তা নিয়ে আমাকে কয়েক কথা শুনিয়ে দিলেও দোষ নেই।

কিছু না ভেবে হঠাৎ আমি টিভি দেখা শুরু করলাম। তা শুধু বিজ্ঞাপন। তাই দেখতে লাগলাম। দেখলাম এক সড়ক দূর্ঘটানার পঞ্চাশজন মৃতের জন্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করেছেন। হঠাৎ মনে হল, এখানে কি যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগের কিছু থাকতে পারতো! তখন কলিংবেল বেজে উঠলো। তা আমার ভালই লাগলো। কেউ আসুক, ছুটির দিন একা আজকে বিরক্ত লাগছে। দরজা খুলে দেখি বাড়িওলা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে। হেসে ভিতরে আসতে বললাম। এমন যে বাসায় ফুল থাকলে তা দিয়েই অভ্যর্থনা জানাতাম।

তিনি ঢুকতে ঢুকতে অনেকটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে বললেন, আপনাকে জ্বালালাম না তো?
এ প্রশ্নের মানে আমি বুঝি। বুঝলাম কিছুদিন আগে যেহেতু তার স্ত্রী আবার বিদেশ চলে গেছে, আজ একটু বেশিই খারাপ লাগছে একা একা। আমি বললাম, আমিই আপনার কাছে যাবো ভাবছিলাম।

আমার উত্তরে তাকে খুব খুশিই মনে হল। হেসে বললেন, বয়স হয়েছে। কিন্তু এদেশ ছেড়ে যেতে পারি না। তাছাড়া উপরে উঠতে খুব ভয়। একবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাবার জন্য উঠে পড়েছিলাম। যেই প্লেন ছুটলো, আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম। আর উঠা হয়ে উঠেনি।

রুমে এসে বসে বললাম, তা হয় কারো কারো। যেমন ঝড় উঠলেই আমার মনে হয় বাবামায়ের কাছে চলে যাই। তবে নিজ দেশে থাকার কিন্তু মজাই আলাদা।

‘হুম। তা খুব ভালই লাগে। কিন্তু বেশিরভাগ সময় চোখ বুজে থাকতে হয়।’ হাসতে হাসতে তিনি বললেন। কথাটায় এক ধরনের তিক্ত অনুভূতি আছে। তবে আমি তা নিয়ে মাথা ঘামালাম না। বললাম, চা খাবেন?

চায়ের কথা শুনে তিনি হঠাৎ একটি বোতল বের করলেন। দেখেতো চক্ষু চড়কগাছ। এ দেখি রামের বোতল। খুব মজা পেলাম। কিছু না বলে গ্লাসের জন্য গেলাম। কিছু বললাম না কারণ ভয় হল, উল্টাপাল্টা কিছু যদি মুখ দিয়ে বের হয়ে যায়। এই একা লোকটা যদি কষ্ট পান! আমি যখন গ্লাস এনে দিলাম বললেন, একা একা কোনোভাবেই জোশ পাচ্ছিলাম না।

আমি কী বলবো! আনন্দ হচ্ছিলো এ ভেবে শেষ পর্যন্ত তিনি আমাকে মনে করলেন। শুধু রামের কথা ভেবে না, ছুটির এই বিরক্তিকর সময়টা উড়িয়ে দেয়ার জন্য। ভাবলাম খুব আনন্দ সহকারেই আজ রাম গিলবো। ফলে তাই হলো। দুজনেই খুব উৎসাহ সহকারে রাম গিলতে লাগলাম। সাথে তিনি অদ্ভুত ধরণের গল্পো শোনালেন। তিনি নাকি একবার এক বাঘকে ইঁদুরের পেছনে দৌড়াতে দেখেছেন। তা বাঘটা নাকি ইঁদুর ধরতেই পারেনি। হা হা হা!

আমি খুব মন দিয়ে শুনছিলাম। তার সব কথাই বিশ্বাস করলাম। হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন, একদিন নাকি তার স্ত্রীকে খুব মেরেছিলেন। আমি তো অবাক! বললেন, শুনো, এখন তো চুপ থাকি, সে চেঁচালেও কিছু বলিনা। কিন্তু একদিন ছিল যখন সব সময় চুপ মেরে থাকতো।

এ কথা আমার বিশ্বাসই হতে চাইলো না। আমি কোনোদিন তেমন চুপ থাকতে শুনিনি? তবে ভাবলাম। এই চুপ থাকার বিষয়টি হয়তো বহু যুগ আগের কথা। হঠাৎ আবার বলে উঠলো, ছেলে মেয়েগুলা যা হয়েছে, আমার কথা মনেই রাখে না! এই যে দেশ! এখানে ফিরতেই চায় না! শুধু বলে বুড়ো, তুমি চলে আসো। মানুষের হয়েছে কি জানো, একবার উপরে উঠলে মাটিতে আর পা পড়তে চায় না!

বুঝলাম, তার অনেক রাগ সবার প্রতি। ভাবলাম, হয়তো রামটা খাওয়া বেশি হয়ে যাচ্ছে। তবে তা নিয়ে মাথা ঘামালাম না। তার গল্প আমার ভালই লাগছে। তবে আমাকে যেহেতু বিকালে বেরোতে হবে অন্তত কোনোভাবেই মদ্যপ হওয়া চলবে না। হঠাৎ আরেক গল্প বললেন, তার বাবা ছেলেমেয়েদের খুব পেটাতে পছন্দ করতেন। প্রতিদিনই তার ভাইবোনদের কাউকে না কাউকে পেটাতেন। তবে তিনি তার কোনো ছেলেমেয়েকেই পেটাননি। এক সময় যে ইচ্ছে হত না, তা না। কিন্তু যখন মনে হত তিনি তার বাবাকে ঘৃণা করতেন, তখন আর কিছু বলতে পারতেন না। এবার কিছুটা কান্নার স্বরেই বলে উঠলেন, এখন আমার ছেলেমেয়েরা কেউ কাছে থাকে না। কিন্তু আমি বাবার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার সাথেই থেকেছি, এই বাড়িতে!

তার কথা শুনে মনে হল, এখন তার খুব আফসোস হচ্ছে যে কেন তাদের পেটাননি! তবে আমার মনে হল, এটা ভাবা খুব অন্যায় হবে। তাই অন্য কিছু ভাবতে চেষ্টা করলাম। তিনিই তার সুযোগ করে দিলেন। প্রশ্ন করলেন, তুমি কখনো পুতুল নাচ দেখেছো? এর মত বিশ্রী জিনিস আর হয় না। এক ধরণের ঠকবাজি। জীবনের প্রতি একেবারে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেয়া!

এ কথার মানে আমি বুঝলাম না। কী বোঝাতে চাইলেন তিনি? হঠাৎ করেই উঠে দাঁড়ালেন। এমন নয় যে টলছেন, তবে কেমন যেন ভাঁড়ের মত হেঁটে চললেন দরজার দিকে। বোতলটাও সাথে নিয়ে নিলেন। তা লুকিয়ে, খুব সচেতনভাবে। যদিও তাতে কিছুই তেমন অবশিষ্ট ছিল না। তবে নিয়ে নেয়ায় ভালই হয়েছে, আমার মনে হল। ঝুমা বা মা এসে দেখলে খুব রাগ করতো।

বাড়িওলা বিদায় নেয়ার পর মনে হল ভার মুক্ত হলাম। সাথে সাথেই নিজেকে বিরক্তিকর রকমের খারাপ কিছু মনে হল। নাহ! এটা খুব খারাপ চিন্তা, বলে উঠলাম। তা জোরেই। তবে অবশেষে এই চিন্তা করেছি বলে বেশ লাগলো। মনে হলো, যাক নিজের প্রতি সুবিচার করা হলো। কিন্তু হঠাৎ মনে হল তিনি এভাবে চলে না গেলেও পারতেন। কেন এমন রাগ হল? তিনি এমন রাগ হতেই এসেছিলেন? আর কেউ কি ছিলো না যার কাছে এই কথাগুলো বলতে পারেন? এই ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারেন? হঠাৎ মনে হল, আপন কাউকে এমন কথা বলা যায় না। হয়তো দূরের কাউকেই বলতে হয়। কিন্তু দূর ঠিক কতো দূর?


— End —

About the Author

Sham Pulok