Novel

অধ্যায়-১: বৃষ্টি ভেজা রাতের কথা

Excerpt

‘হুম। আর আপনাকে দেখিনি। অনেক বছর পর কয়েকবার দেখেছি। তা অবশ্য আপনি জানেন না। হঠাৎ দেখা হয়েছে। কিন্তু কথা বলতে যাইনি।’ ঝুমা বললো। আমি এ প্রশ্ন করলাম না কেন সে কথা বলেনি। চুপ করে রইলাম। আমার মনে হল আমি যেমন ভেবেছিলাম এতক্ষণ তার অনেক কিছুই বলা হয়ে গেছে। তাছাড়া অনেক রাত হয়ে গেছে। যদিও আমার বাড়ি ফেরার খুব একটা তাড়া নেই। কিন্তু তার বাসায় যাওয়া দরকার বলেই মনে হলো। হয়তো এবার তার ফেরা উচিৎ। এটা এক অযাচিত অতিভাবনা। কিন্তু হঠাৎ আমার মনে হল আমি আজ তার হাতটি ধরতে পারি। হয়তো চাইলেই পারি। সেই ছেলেবেলাতেই হাতদুটি এত অদ্ভুত সুন্দর মনে হত। আঙুল দিয়ে যখন সে লেখতো। অথবা ছবিতে রঙ করত। আমি তাকিয়ে থাকতাম। যদিও সে খুব একটা ফিরে তাকাতো না। আজও তাকালাম। বুঝলাম আগের থেকে অনেক সুন্দর হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝেই এমন সুন্দরভাবে নড়ছে! সে আজ কী ভেবে জানি না আমার আরও কাছে এনে নাড়ালো। ঠিক চোখের সামনে। হেসে বললো, এ বিষয়টা আমি জানি।

Genre / Keywords Existentialism Stream of Consciousness Absurdism
Sham Pulok —
অধ্যায়-১: বৃষ্টি ভেজা রাতের কথা

বৃষ্টি ভেজা রাতের কথা

সারা সন্ধ্যা বৃষ্টি হবার পর হঠাৎ থেমে গেল। তবে আমি বৃষ্টির শব্দ শুনিনি। দরজা জানালা বন্ধ করে বসে বসে মোজার্ট শুনেছি। হঠাৎ করেই আমি মোজার্টে বুঁদ হয়ে আছি। তাছাড়া ঝড়টা চিরকালই আমার কাছে ভীতির ব্যাপার। এমনকি আজও ঝড়ের মাধ্যমেই বৃষ্টিটা শুরু হয়েছিল। এক বিকট সম্ভাবনাময় মেঘ হানা দিয়েছিল কখন যেন। আমি তার খেয়াল রাখিনি। সূর্য ডোবার সময় যখন গোধূলি আকাশ রক্তে লাল হবার কথা ছিল ঠিক তখন ঝড় শুরু হয়েছিল। তারপর টানা বৃষ্টি। তবে ঠিক কখন থেমেছে আমি জানি না। কিন্তু, হঠাৎ করেই যখন বাইরে বের হতে ইচ্ছে হল দেখি বৃষ্টিও থেমে গেছে। তখন আকাশ বাতাসের ফুরফুরে মেজাজ, কোলাহলহীন নিঃসঙ্গতা আমার যাপিত বাস্তবতাকে তুলে ধরছে যেন। তাই ঘরের আলোয় একটি অন্ধকারের চুমু দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম। এই অন্ধকারের চুম্বনের ভাবনাটা অন্তত আনন্দ দিলো। যদিও ব্যাপারটা হলো লাইট বন্ধ করে বের হয়ে গেলাম। হঠাৎ-ই পুরো কক্ষ অন্ধকারে ছেয়ে গেল।

রাতে হাঁটতে বের হলে কোনো একটি ভাবনা মাথার মধ্যে ঢুকে তারপর তার ডালপালা বিস্তার করতে থাকে। সব ডালে অবশ্য ফুল ফোটে না। না সব ফুলে ঘ্রাণ থাকে। আজ আমি বুঝতে চেষ্টা করলাম, কোন ভাবনাটা তার প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবে। কিন্তু আজ কোনো ভাবনাই তার প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হচ্ছে না। একটার পর একটা ভাবনা মাথার ভিতর খেলে গেল। বাসা থেকে বের হয়ে হঠাৎ করেই বাবার কথা ভাবতে লাগলাম। কিন্তু এই ভাবনা বেশিক্ষণ আঁটকে থাকলো না। গতকাল যে মেয়েটি জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছিলো তার কথা ভাবতে লাগলাম। যদিও আমি তেমন বারান্দায় যাই না কিন্তু যখন গেলাম তখন উঁকি দিচ্ছিলো। আমিও কেমন যেন উৎসাহিত হয়ে উঠলাম। তার দিকে চেয়ে হেসে দিলাম। তাই বলে মুখ টিপে হাসি না। রীতিমত উচ্চস্বরে হাসি। তবে তাকে কোনোভাবেই ভয়ংকর বলা যাবে না। কিন্তু মেয়েটি চলে গেল। এর ঠিক কারনটি মাথায় গেল না। তবে কক্ষে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকবার সেই হাসি দিলাম। আমার কাছে ভালই লাগলো। এবং হাসি দেবার কারনে নিজেকে বোকা বোকাও লাগলো না। এই ভাবতে ভাবতে হঠাৎ পায়ে আঘাত পেলাম। তা আঘাত বেশি না হলেও ভাবনা অন্য দিকে মোড় নিলো।

আমার পরিচিত এক ছেলে বলতো যেদিন রাস্তায় চলার সময় পায়ে এমন আঘাত পেত সেদিন তার খারাপ কিছু ঘটতো। ছেলেটা কলেজে আমার সাথে পড়তো। মনে পড়ে একদিন হঠাৎ হাতেও আঘাত পেয়েছিল। কোনভাবে হাতটা কেটে ফেলেছিল। তবে তখন খারাপ কিছু ঘটেছিল কিনা আমার জানা নেই। এমন কিছু বলেওনি। কিন্তু উষ্টা খাওয়া নিয়ে সংস্কারটা স্পষ্ট। এইসব ভাবনা আমার তেমন ভালো লাগছিল না। অবশ্য উষ্টার বিস্তারিত আলোচনা আমার ভাবনায় আসতেই পারতো। যা এলো না। আমি আবার সেই উঁকি দেয়া মেয়েটার কথা ভাবতে চাইলাম। কিন্তু হঠাৎ করেই একটি চায়ের দোকানে ঢুকে পড়লাম। এক কাপ দুধ-চা দেয়ার কথা বলে সেখানে অন্য যারা ছিল তাদের কথা শুনতে লাগলাম। এই চায়ের দোকানদারটা খুব ভাল ছিল। কিন্তু মাথায় চুল ছিল না। গরীব মানুষের মাথায় চুল না থাকলে বেখাপটা লাগে। আমার কাছেও লাগতো। কারন তাদের চুলহীন মাথা বড়লোকের মত তেমন তেলাক্ত ভাব থাকে না। একটি মলিন মুখের মানুষের মাথায় চুল না থাকাটা কিছুটা বিরক্তিকরও। অসুন্দরতো বটেই। তবে তার একটি ভাল দিক ছিল, তা হল সবসময়ই সে আমার সাথে হাসিমুখে কথা বলতো। হাঁটতে বের হলে তার দোকান হতে অন্তত এক কাপ চা খেতাম। সে হাসিটা না দিলে হয়তো আসতাম না।

অন্যদের কথাশুনে হঠাৎ বিরক্তি চলে আসলো। কারন তারা গালাগালি আরম্ভ করেছিল। এটা তারা সব সময়ই করে। যখন এই গালাগালির মাত্রা অনেক বেড়ে যায় তখন আমি বের হয়ে যাই। আজও বের হয়ে গেলাম। বের হবার আগে চায়ের টাকাটা দিতে গেলাম তখন কেন জানি দোকানদার আজ লজ্জার হাসি দিল। আমি বুঝতে পারলাম না, কেন এমন করলো। তবে আমিও হাল্কা হাসলাম। সে জানালো টাকাটা আজ সে নেবে না। গতরাতে তার একটি ছেলে হয়েছে। তাই সবাইকে চা খাওয়াচ্ছে। কিন্তু আজ তো তার টাকা আরো বেশি দরকার! তার এই বোকামির জন্য স্ত্রীর কাছে নির্ঘাত বকা খাবে। কি আর করা! আমি কিছু টাকা বের করে তাকে দিয়ে বললাম, তোমার ছেলেকে উপহার দিলাম। এবার তার লজ্জা দেখে উচ্চস্বরেই হাসি দিতে ইচ্ছে হলো। এমন চুলহীন খয়েরি দাঁতের লোককে এমন লজ্জা পেতে আগে দেখিনি। গ্রামে থাকতে দেখেছি খয়েরি দাঁতের লোকেরা থাকে ধুরন্ধর। তারা আর যাই করে এমন গোবেচারার মত লজ্জা পায় না। শেষে খুব কাছে গিয়ে বললাম, খুশিতে যে তুমি খুব বোকামী করছো তা বুঝেই স্ত্রীর বকাটা বাঁচাচ্ছি। নিয়ে নাও। এবার চুপ করে নিয়ে নিলো। তবে হাসিটা মিলিয়ে গেল।

সেখান থেকে বের হয়ে আমি তার মিলিয়ে যাওয়া হাসির কথা ভাবতে লাগলাম। এ কথাটা আমার না বললেও হতো। তার খুশিটাই মাটি করে দিলাম। যে মানুষ খুব কম দিনই এমন খুশি থাকে তাকে অন্তত অখুশি করা উচিৎ হয়নি। হঠাৎ ইচ্ছে হল ফেরার সময় টাকাটা আমি নিয়ে যাব। তারপর কিছু একটা কিনে দিয়ে দেব একদিন। কিন্তু তার তো টাকাই বেশি দরকার! তার যে কোন জমানো টাকা নেই তা খুব বুঝেছি। থাকলে সে মিষ্টি কিনেই খাওয়াতো। তাই বলে এক কাপ চা খাওয়ানোর অধিকারটাও দেব না? আমি তো উপহার দিতেই পারি। নিছক ঐ কথাটা বলা উচিৎ হয়নি। লোকটাকে এমন লজ্জা পেতে দেখে কী বলব বুঝতেই পারলাম না। মনে হল টাকাটা হয়তো সে নেবেই না। তবে এখন বিরক্তই লাগছে। আমি না বললেও এক সময় লোকটি বুঝতে পারতো। হয়তো অনেকেই এমন উপহার তাকে দিয়েছে। নাহ এ নিয়ে আর ভাববো না, হঠাৎ নিজেকে বললাম। অন্য কিছু নিয়ে ভাবতে চাইলাম। নাহ! জীবনে যা করেছি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি করেছি বোকামি, নিজেকে বলতে লাগলাম। হঠাৎ ভেজা রাস্তা চোখে পড়লো। খুব ভালই লাগল, হালকা হলুদ আলোয় ভেজা রাস্তা। তা নিয়ে তেমন ভাবা হল না। কবে এক লোককে আমি টাকা দিতে পারিনি। যখন তার টাকাটা খুব দরকার ছিল। তার মেয়েটি অসুস্থ ছিল। কিন্তু মনে হল এ নিয়ে ভাবা বড় ধরণের বোকামী। অনেকটা পাগলামিই। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনটা বেশিই খারাপ হয়ে গেল। খুব জোরে হাঁটা শুরু করলাম। যদিও এমন জোরে হাঁটাটা তেমন বেমানান না। এমন মাঝরাতে সবাই জোরেই হাঁটবে। কারন যত তাড়াতাড়ি বাসায় যাওয়া যায় তত ভাল। কিন্তু আমার তো এমন তাড়া নেই! কেনই বা থাকবে! আমিতো সেটা চাই-ই-নি কোনোদিন। খুব ধীর একটি জীবন চেয়েছি। তবে সফলতা এসেছে। বাবা এটুক বুঝিয়েছিলেন, জীবন ধারণের জন্য টাকাটা খুব দরকার। কিন্তু এ জীবনটা কি আসলেই আমি ধারণ করতে পেরেছি? দ্বায়টা কেমন দ্বিধাদ্বন্দে ডুবে থাকে। মাঝে মাঝে মনে হয় ভুতের মত ঘাড়ে চেপে বসেছে জীবনটা। ঘাড় মটকে দেবো?

হঠাৎ করেই উচ্চস্বরে হেসে উঠলাম। এটা ভেবে, যেহেতু চারদিকে কেউ নেই, তাই হাসতে মানা নেই। কেউ পাগল ভাববে না। আর ভাবলেই কি! কথা বলার অধিকারটা যেমন মানুষের আছে, পাগলামী করার অধিকারটাও আছে। কিছুক্ষণ হাসার পর মনে পড়লো ছেলেবেলা থেকে মানুষকে একটু বেশিই স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম। এটা শুধু পরিবারের মানুষকে না, আরো অনেককে। যেমন কাউকে ভাল পড়াশোনা করতে দেখলে সবাই চাইবে ছেলেটা ভাল রেজান্ট করুক। তারপর ভাল ফল করলে চাইবে ডাক্তার হোক। গ্রামে যারা একটু মারামারি বেশি করে তারা চাইবে উকিল হোক। কেউ কেউ চেয়ে বসবে এ ইঞ্জিনিয়ারই হোক। আমিও এমন সব স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম। ভেঙ্গেছিও। বিষয়টা অবশ্য কিছুটা খারাপ। তবে জীবনের সাথে মানিয়ে নিয়েছি। এটা আমি বুঝেছি, মানুষ স্বপ্ন দেখবেই। যেমন এখন একটি ভাল চাকরি করি, সবাই চাচ্ছে আমি যেন এর সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠান করি। এসব যখন ভাবছি হঠাৎ একটি গাড়ি আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। প্রথমে কিছুটা ভয় পেলাম। পরক্ষনেই ভাবলাম পার্স তো দূরের কথা মোবাইলটাই সাথে আনিনি। তাই ভয়টা উড়ে গেল। তবে পরক্ষনেই মনে হল প্রাণটা তো সাথেই আছে। যদি সেটা বাসায় রেখে আসতে পারতাম! এমন হতো যে শুধু স্বপ্ন আর ভাবনা নিয়ে ভেজা ভেজা আকাশের নীচে হাঁটছি, আর প্রাণটা বাসায় কোনো কৌটার মধ্যে! হতে পারে ম্যাচবক্সের মধ্যে একটা কালো ভ্রমর; সেই কালো ভ্রমরের প্রাণে আমার প্রাণ! অবশ্যই সেটা হতে হবে রাতের বেলা। কারণ দিনের বেলা মানুষ আর গাড়িগুলা এতো বেশি চ্যাঁচ্যাঁয় যে কোনোভাবেই মাথা ঠিক থাকে না। কোনকিছু নিয়েই ভাবা যায় না।

কিন্তু এসব যখন আমি ভাবছি তখন কেউ গাড়ি থেকে বের হয়ে আসলো যাকে কোনোভাবেই ভয় পাওয়া চলে না। আলো কমতি থাকা সত্ত্বেও তাকে চেনা যায়। এটা বললে খারাপ শোনাবে না যে সে নিজেই একটি আলো, টুকরো আলো নয়, পরিপূর্ণতা। আমি ভাবতেই পারিনি সে এভাবে রাতে গাড়ি থেকে বের হবে। মানে আমাকে দেখে। যেখানে আমাদের শেষ কথা হয়েছে বহু বছর আগে। ঠিক কতো তা জানতে হলে ভাবতে হবে। ভেবে নেবো? থাক পরে ভাবা যাবে।

যেদিন শেষ দেখা হয়েছিল সে দিনটা ছিল খুব আজব, অনেক মজার। আজও সেদিনের কথা মনে পড়লেই আমি উচ্চস্বরে হাসি। তাকে দেখেই আমার হাসি পেল। জোরেই হেসে ফেললাম। তবে আজ সে কান্না করলো না। সেও হাসলো। তবে আমার মত জোরে না। দাঁতও দেখা গেল না। আমি সে দিকে লক্ষ রাখলাম। কারন বিভিন্ন জায়গায় আমি যে তার দাঁত বের করা হাসির ছবি দেখেছি তা খুব প্রিয় ছিল। সে বলে উঠলো, হাসছেন যে! আজও দেখি একই বোকাটে হাসি আপনার!

যদিও তার বোকাটে বলাটা আমার খারাপ লাগলো না। তবুও আমার হাসিকে আমি কোনোভাবেই বোকাটে বলতে পারলাম না। আমি উত্তর না দিয়ে আবার হাসলাম। ‘আপনি কি ভেবেছেন আজও আমি কাঁদবো?’ হাসতে হাসতে বললো সে।

কিছু না ভেবেই বলে উঠলাম, নাহ! এতদিন পর এমন মাঝরাতে কেঁদে উঠলে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারবো না। সেদিনও প্রথমে আমি ভাবিনি তুমি কেঁদে উঠবে। পরে যখন কাঁদতে শুরু করলে আমার খুব হাসি পেল। এরপর যতদিনই ভেবেছি আমার হাসি পেয়েছে। এমনকি তোমার হাসি মাখা সুন্দর ছবি দেখেও। যেমন আজও হাসি পেল।

সে হাসলো। কিছু বললো না। দেখলাম সে শাড়ি পড়ে আছে। মাঝরাতে কেউ শাড়ি পড়ে ঘুরতে বের হয়! পরে মনে পড়লো তার সময় কই দিনে বের হবার! হঠাৎ বললো, চলুন কোথাও বসি।

আমি সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেলাম। এই ভেবে, আজ না আবার কাঁদতে শুরু করে দেয়! আমি যেহেতু সংসদ ভবনের কাছেই চলে এসেছিলাম। বললাম, সামনে গিয়ে বসি। কিন্তু সে বললো সংসদ ভবনের পেছনের দিকটায় বসবে। গণভবন থেকে একটু এগিয়ে, লেকের ব্রিজটার পাশে। সেদিকেই যাচ্ছিলো। আমি তাতেও রাজি হয়ে গেলাম। আজ এমন যে, সে যা বলবে তাতেই রাজি হয়ে যাবো।

হাঁটতে হাঁটতে বললো, খুব ব্যস্ত থাকি। কাজটা যেহেতু অভিনয় সব সময় মানুষের সাথেই বের হতে হয়। দেখা যায় খুব কম সময়ই একা থাকার সময় পাই। এই যে এখানে এসেছি দেখা যাবে পরিচিত কোন পরিচালক বা অভিনেতা যদি বাসায় যায় আর শুনে যদি এখানে এসেছি কেউ না কেউ চলে আসবে। কারন তারা জানে যদি তারা এসে পড়ে তাদের সময় দেবোই। আজ বহুদিন পর এভাবে একা বের হলাম। একটা মানুষের তো একা থাকার কিছু সময় দরকার, কী বলেন?

এবার আমি আর হাসলাম না। কেন তা তেমন বুঝিনি। শুধু মাথা নাড়লাম, খুব ধীরে ধীরে। সে আবার বললো, যেহেতু অভিনয়ের জীবনটা খুব নড়বড়ে, তাই সবসময় মানিয়ে চলতে হয়। তাছাড়া আমি তত উপরে এখনো উঠতে পারিনি, যখন আমার মতো চলতে পারবো। হয়তো একদিন পারবো।

হঠাৎ আমার মনে হল, এত দিন পর যেখানে আমাদের দেখা হল সেখানে আমাদের কথাগুলো খুব একটা মানানসই নয়। আমাদের হয়তো অন্য কিছু নিয়ে কথা বলা উচিৎ ছিল। কিছুটা উল্লোসিত কথোপকথন। পরে মনে হল, তা হয়তো হতো কিন্তু আমার অমন হাসি সব ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। ওভাবে হেসে ওঠা ঠিক হয়নি। মাঝে মাঝে তার ছবি দেখে ভাবতাম হঠাৎ দেখা হলে কি বলব, তা কিছুই বলা হয়নি। আসলে সেই ভাবনার মধ্যে হাসিটা একদমই ছিল না।

‘এখন কী করছেন? এখনো কি আগের জায়গাতেই আছেন?’ আমাকে চুপ থাকতে দেখে সে বললো।

‘হুম। প্রথম যে চাকরিটা পেয়েছিলাম তাই করছি। তুমি কি সেটার কথাই শুনেছো?’ আমি হাসতে হাসতে বললাম।

‘হুম। কিন্তু ভাবিনি আপনি এমন একটি নিরস চাকরি এতদিন করবেন। ছেলেবেলা আপনাকে অনেক বেশি চঞ্চল মনে হত। যদিও আজ হাসি শুনে আগের মতই মনে হয়েছে। কিন্তু যখন অন্য কারো কাছে আপনার খবর শুনেছি তখন মনে হয়েছে আপনি হয়তো অনেক নীরব হয়ে গ্যাছেন। তবে তেমন অবাক হইনি। অনেকেই তো ধীরে ধীরে বদলে যায়।’

সে আমার খবর নিয়েছে বলে আমার অবাক লাগলো। পরে মনে হল সেদিনের গল্প যেহেতু অনেকেই জানতো তাই ইচ্ছে করেই কেউ হয়তো আমার কথা শুনিয়েছে। আমি বললাম, আমি তেমন বদলাইনি। তবে চাকরির বিষয়টা অন্য। চাকরিটা করছি যেহেতু টাকার জন্য। টাকাটা ভালই দেয় তারা। তাছাড়া দ্বিতীয়বার ইন্টারভিউ দেবার কথা ভাবলেই বিরক্ত লাগতো।

এবার সে জোরেই হেসে উঠলো। বললো, এই প্রথম কাউকে দেখলাম যে কিনা ইন্টারভিউ দেবার ভয়ে একটি নিরস চাকরি করছে।

এ শুনে আমার ইচ্ছে জাগলো নিজেকে উপস্থাপন করি। তাছাড়া এটা বলি চাকরিটা তত নিরস না। বিভিন্ন ধরণের দার্শনিক উক্তির কথা মনে পড়লো যা অন্যদের বলে থাকি। কিন্তু তা না করে হঠাৎ একটি মুখস্ত করা প্রশ্ন করে ফেললাম, ‘বিয়ে করোনি কেন?’ প্রশ্নটা যদিও সেই কলেজ জীবনে ভাবতাম। সে অভিনয় শুরুর আগে। কিন্তু এখন যে এ প্রশ্ন খাটে না, হঠাৎ তা ভুলে গেলাম।

এ কথা শুনে এবার উচ্চস্বরে হেসে উঠলো সে। শেষে আমার প্রশ্নের মুন্ডুপাত করলো। বললো, আপনার কি মনে হয় সেই দিনের জন্য বিয়ে করিনি?

আমি কী বলবো ভেবে পেলাম না। শেষে সত্যি কথাই বলে ফেললাম। ‘এক সময় এ কথা ভাবতাম দেখা হলে এমন প্রশ্ন করবো। তা অনেক অনেক দিন আগে। এখন এমন কিছু বলবো ভাবিনি। কিন্তু হঠাৎ বলে ফেললাম। তাছাড়া আমাদের কথা এমন অদ্ভুতভাবে শুরু হয়েছে যে আমি কোনদিন কল্পনাই করিনি!’

‘আমি কখনোই ভাবিনি আপনি এমন একটি মানুষ হয়ে উঠবেন।’ বলে উঠলো সে।

এ কথা শুনে আমার কিছুটা ভাল লাগলো। যাইহোক অন্তত আমিই শুধু অবাক হইনি। সেও অবাক হয়েছে। শুধু আমি একা অবাক হলে বিরক্ত লাগতো। তাছাড়া এটা অন্তত পূর্বচিন্তার মত চলছে। সবসময়ই আমি ভেবেছি, আমাদের যদি দেখা হয় তবে দেখা যাবে দুজনেই দুজনকে দেখে অবাক হচ্ছি।

আমি যখন কিছু বললাম না। সে তখন বললো, (কিছুটা হেসে, যে হাসি অনেক উজ্জ্বল) আপনার কি সেদিনের কথা মনে আছে?

এই প্রশ্ন শুনে আমার এত ভাল লাগলো মনে হল এতক্ষন ধরে এই প্রশ্নের অপেক্ষাই করছিলাম। সাথেই সাথেই অতি উৎসাহে উত্তর দিতে গেলাম। কিন্তু কিছু না বলেই থেমে গেলাম। সে আমার দিকে তাকিয়েছিল। কিছু হয়তো বুঝলো। তবে কিছু বলার আগেই আমি বললাম, ‘হুম। খুব মনে আছে। মাঝে মাঝেই তো ভাবি আর খুব হাসি।’ হঠাৎ এমন একটা ভাব করলাম নিজেরই মায়া হল নিজের জন্য। এত বোকা কেউ হয়! তবে সে স্বাভাবিক ভাবেই বললো, আমারও মনে পড়ে। আপনি তো চলে আসলেন তারপর। কিন্তু আমাকে বহুদিন থাকতে হয়েছে সেখানে! সবাই খুব জ্বালাতো। বলতো, ঝুমা, তুমিও কি ওকে ভালবাসো? অমনভাবে কাঁদলে কেন? আরো অনেক কিছু। এ নিয়ে প্রায়ই আমাকে কাঁদতে হতো। তবে এখন ভাবলে হাসি পায়। আপনি কি ভেবে এত বড় গাছে উঠেছিলেন?

প্রশ্নটা আমার ভাল লাগলো। হেসে বললাম, আমাকে একজন বললো ছাদে উঠে বল, তাহলে রাজি হয়ে যাবে। আমি ভাবলাম ছাদ তো তত উঁচু না, তাই গাছে উঠে গেলাম। গাছটা কিন্তু অনেক উঁচু ছিল।

‘যদি পড়ে যেতেন? আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম’ ঝুমা বলে উঠলো।

‘তাই বলে কাঁদতে কাঁদতে দৌড় দেবে? আমি এটা ভাবিনি। ঐ ছেলেটা বলেছিল, তুমি হাত নেড়ে হাসবে। তারপর আমি নীচে নেমে আসবো। কিন্তু বদলে তুমি কাঁদলে। আর স্যার তার চিকন বেত দিয়ে মারলো। বাসায় বাবাও মারলো। তারপর এমন হল আর পড়ালেখাই হবে না। শেষে বাড়িই ছাড়া।’ এই বলে আবার উচ্চস্বরে হেসে উঠলাম। বহুক্ষণে হাসি থামালাম। দেখি হাসিমুখে ঝুমা চেয়ে আছে। আমি খুব সতর্কভাবে খুঁজলাম তার চোখের কোণে জল আছি কিনা! খুব একটা আলো ছিল না তাই বুঝা গেল না।

কিছুক্ষণ পর ঝুমা বললো, তার মানে আপনি এমন কিছু ভাবেননি তখন আমি ভালবাসি না বললে আপনি গাছ থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়বেন?

‘এমন কিছু তো ঐ ছেলেটা আমাকে বলেনি। সে শুধু বলেছিল যদি ছাঁদ থেকে বলি তাহলে তুমি রাজি হবে। তাই ভেবেছিলাম আরো উঁচু থেকে বললে দোষ কী? তাই চিৎকার করে বললাম, ঝুমা, আমি তোমাকে ভালবাসি! বহুবার বলেছি। তারপর দেখি  তুমি কাঁদতে কাঁদতে বের হয়েছো। তখনও আমি চিৎকার করছি। কিছুক্ষণ পর দেখি, তুমি দৌড় দিলে। আমি আর কী করবো! নেমে গেলাম। মজার বিষয় হলো বাড়ি থেকে চলে আসার আগে তোমার সামনে যেতেই সাহস পাইনি। আর সেই ছেলেটিকে একটি ঘুষি মেরেছিলাম।’ আমি হাসতে লাগলাম।

‘হুম। আর আপনাকে দেখিনি। অনেক বছর পর কয়েকবার দেখেছি। তা অবশ্য আপনি জানেন না। হঠাৎ দেখা হয়েছে। কিন্তু কথা বলতে যাইনি।’ ঝুমা বললো।

আমি এ প্রশ্ন করলাম না কেন সে কথা বলেনি। চুপ করে রইলাম। আমার মনে হল আমি যেমন ভেবেছিলাম এতক্ষণ তার অনেক কিছুই বলা হয়ে গেছে। তাছাড়া অনেক রাত হয়ে গেছে। যদিও আমার বাড়ি ফেরার খুব একটা তাড়া নেই। কিন্তু তার বাসায় যাওয়া দরকার বলেই মনে হলো। হয়তো এবার তার ফেরা উচিৎ। এটা এক অযাচিত অতিভাবনা।

কিন্তু হঠাৎ আমার মনে হল আমি আজ তার হাতটি ধরতে পারি। হয়তো চাইলেই পারি। সেই ছেলেবেলাতেই হাতদুটি এত অদ্ভুত সুন্দর মনে হত। আঙুল দিয়ে যখন সে লেখতো। অথবা ছবিতে রঙ করত। আমি তাকিয়ে থাকতাম। যদিও সে খুব একটা ফিরে তাকাতো না। আজও তাকালাম। বুঝলাম আগের থেকে অনেক সুন্দর হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝেই এমন সুন্দরভাবে নড়ছে! সে আজ কী ভেবে জানি না আমার আরও কাছে এনে নাড়ালো। ঠিক চোখের সামনে। হেসে বললো, এ বিষয়টা আমি জানি।

হঠাৎ আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। মুহুর্তের জন্য ভাবনারা খণ্ডবিখণ্ড উড়ে গেছে। যেনো ঝড়ে পড়া বকপক্ষি, তুলো তুলো ওম। পরক্ষনেই মনে হল এভাবে দাঁড়ানো উচিৎ হয়নি। কিন্তু বসে পড়লাম না। মেয়েটি অবাক বসে রইলো। আমি তার চারপাশ দিয়ে ঘুরতে থাকলাম।

হঠাৎ বললাম, তুমি কি জানো কেউ যদি কখনো হঠাৎ সিংহের মুখে পড়ে তাহলে তার নড়া উচিৎ নয়।  এ কথা শুনে সে হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালো। বললো, অনেক রাত হয়েছে। এখন ফিরতে হবে। তোমার মোবাইলটা দাও তো!

হঠাৎ মোবাইল কেন? অবাক হলাম। বললাম, মোবাইল তো নিয়ে আসিনি। সেও একই কাজ করেছে। কি যেন ভাবলো তারপর বললো, বাসার নাম্বার বলো। বাসার নাম্বার বলেই মনে হল, আবার বাসায় চলে আসবে নাকি? কিন্তু তা কিছু বললাম না। মনে হলো হয়তো এমনিই চেয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই দেখি গাড়িটা আমাদের কাছে চলে এসেছে। গাড়ির কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আমি ভাবিনি গাড়িটি সাথে সাথেই চলে এসেছিল। ড্রাইভার কোথাও বসে অপেক্ষা করছিল। বললাম, আমি ভেবেছি একদিন হয়তো আমাদের দেখা হবে। কিন্তু আজ অন্তত ভাবিনি দেখা হতে পারে। এ বলে উত্তরের অপেক্ষা না করে আবার প্রশ্ন করলাম, তুমি কি মোজার্ট শোনো?

এ প্রশ্ন শুনে খুব অদ্ভুতভাবে তাকালো। হেসে বললো, আজ বাসায় গিয়ে শুনবো। তার কথা শুনে মোজার্ট নিয়ে কিছু বলতে গেলাম। ইচ্ছে হল খুব ভাল একটি লেকচার দিয়ে দেই। কিন্তু তা দেয়ার আগেই সে আমার হাত ধরলো। আর আমি কিছু না ভেবে বোকার মত তার ঠোঁটে চুমু খেয়ে নিলাম। তারপর কিছু না বলে কাঁপতে কাঁপতে পেছন দিকে হাঁটতে লাগলাম। কী হয়ে গেল সে হয়তো প্রথমে বুঝতে পারেনি। কারন তার নড়ার শব্দ আমি পেলাম না। কিছুক্ষণ পর শোনলাম সে বলছে, ‘সত্যি আমার নড়া উচিৎ হয়নি।’ তারপরও আমি পেছনে তাকাতে পারলাম না। এভাবে চুমু খাওয়ার কথা আমি ভাবি-ইনি। সে এটাকে স্বাভাবিকভাবে নিলেও। এটাই ভেবে পাচ্ছিলাম না সে কেন এটাকে স্বাভাবিকভাবে নিল। হয়তো এজন্য, সে অভিনয় করে। এর থেকে ভালো কোন উত্তর আমি পেলাম না। কিছুক্ষণ পর গাড়ি ছাড়ার শব্দ পেলাম। তারপরও আমি পেছনে তাকালাম না। তারপর গাড়ির শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। এক সময় দেখালাম, আমি বাসার পৌছে গেছি। খাটের কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া কিছুই রইলো না। পরদিন জানালা দিয়ে উঁকি দেয়া মেয়েটি প্রশ্ন করলো, আমি কেন রাতে এমন পাগলের মত হেসেছিলাম! এ কথা শুনে আমার আবার হাসি পেল। আবার উন্মাদস্বরে হেসে উঠলাম।


— End —

About the Author

Sham Pulok