Novel

অধ্যায়-৫: একটি অদ্ভুত ভাবনা ও গ্রেফতার

Excerpt

‘এমন যদি হয় পৃথিবীর সব মানুষ একসাথে ঘুমিয়ে গেল। সব বলতে একেবারে সব। কেউ কোথাও জেগে নেই। কারো কোন কাজ নেই। সবাই ঘুমোচ্ছে। এমনকি দিনের আলোরও পরোয়া করছে না। এরপর সবাই একসাথে স্বপ্ন দেখা শুরু করলো। স্বপ্নে এমন দেখা শুরু করলো যে তাদের যার যা করার কথা ছিল তাই করছে।’ এ পর্যন্ত ভেবে আমি হা হা হা করে উচ্চস্বরে হেসে উঠলাম। দেখলাম রাস্তার অনেকেই আমার দিকে তাকাচ্ছে। আমি চুপ মেরে গেলাম। তবে ভাবতে লাগলাম। মনে হল, ‘এর পর আর কেউ ঘুম থেকে জেগে উঠলো না। তারা স্বপ্নই দেখতেই লাগলো। দিনের পর দিন কেটে গেল, যুগের পর যুগ।’ এ ভাবতে ভাবতে হাসতে লাগলাম। খুব ভাল লাগছে। ইচ্ছে হলো আরও কিছু ডালপালা ছড়ানো যাক। কিন্তু তাতে ব্যাঘাত ঘটলো। হঠাৎ কে যেন আমার কাঁধে হাত রাখলো। আমি পেছন ফিরে তাকাতেই তিনজন লোক আমাকে ঘিরে ধরলো। এমন যে যদি আমি দৌড়াতে চেষ্টা করি। ভাবলাম, আজ তো আমার কাছে ভাল পরিমান টাকাই আছে। তবে চাইলেই দিয়ে দেবো। অন্তত এ বলবো না যে, আমি কাদেরের জন্য টিভি কিনতে যাচ্ছি। টাকাটা এখন দেয়া যাবে না। কিন্তু লোকগুলো টাকা চাওয়ার পরিবর্তে আবদার করলো আমাকে তাদের সাথে যেতে হবে। এটাকে আমার কাছে সাধের আবদারই মনে হল। বলা নেই কওয়া নেই এসে বললো আমাকে যেতে হবে। তবে তা আমাকে খুব বেশি একটা অখুশি করতে পারলো না। আমি বললাম, চলুন, কোথায় যেতে হবে। তবে টাকা চাইলে এখানেই দিয়ে দিতে পারি।

Genre / Keywords Existentialism Stream of Consciousness Absurdism
Sham Pulok —
অধ্যায়-৫: একটি অদ্ভুত ভাবনা ও গ্রেফতার

একটি অদ্ভুত ভাবনা ও গ্রেফতার

 

দুপুরে ঝুমা যখন আমাকে ফোন দিল, আমি তখন পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছি। আমার কণ্ঠ শুনেই বলে উঠলো, তোমার কি হয়েছে। খারাপ লাগছে? চলে আসবো?

কেউ আমার জন্য এমন উতলা হয়ে উঠলে আমার কাছে খুব বিশ্রী শোনায়। তবে তার কথা শুনে সাথে সাথেই আমি উঠে বসলাম এবং সাথে সাথেই বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিলাম। বুঝলাম, শুধু কণ্ঠ না চোখমুখও বিশ্রীরকম ভাবে বদলে গেছে। আমাকে চুপ থাকতে দেখে ঝুমা এটা সেটা বলেই যাচ্ছিল। শেষে বললাম, বহুক্ষণ ঘুমাচ্ছিলাম তাই কণ্ঠ এমন শোনাচ্ছে। আমার কিছু হয়নি।

যদিও বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, তোমার এমন উতলা হবার স্বভাবটা পাল্টাতে হবে। অবশ্য মাকেও এমন বলতে ইচ্ছে হয় মাঝে মাঝে। তবে কখনোই বলা হয়ে ওঠে না। আমার কথা শুনে সে শান্ত হল। আর তেমন কিছু বললো না। আমি যেটা সন্দেহ করছিলাম বলবে, এমন অসময়ে ঘুমিয়েছো কেন? সেটাও বললো না। আমি এতে খুশিই হলাম। ভাবলাম, মা হলে নির্ঘাত সেই কথাই বলতো। ভাগ্যিস এমন সময় তিনি ফোন দেননি!

তবে বাবা হলে কিছু না বলে চুপচাপ ফোনটা রেখে দিতেন। ভাবতেন, দিন দিন ছেলেটি যা তা হয়ে যাচ্ছে। এই বয়সেই ওর দাদার মত বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। যে শুধু পড়ে পড়ে ঘুমায়। এ ভেবে মনে হল এমন ভাবনা মোটেই ঠিক হচ্ছে না। ভাবলাম, বৃদ্ধ হলে মানুষ একটু বেশিই ঘুমায়, শিশুরাও।

দাদা আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ। ভেবেছি, বিয়ে করার পর তাকে এখানে নিয়ে আসবো। তবে বাচ্চা নেবার পর সবচেয়ে আনন্দ হবে। তখন দুইজনে পড়ে পড়ে ঘুমাবে। চাইলে বাচ্চা নেয়ার পরও আনতে পারি। কিন্তু সেটা নিয়ে ঝুমার সাথে কথা বলতেই হবে। তবে এটা ঠিক আমার পরিবর্তে আমার দাদা থাকলে তিনি তার স্ত্রীর মত নিতেন না। তার দাদা হঠাৎ বাসায় উদয় হতো। স্ত্রী জানতেও পারতেন না। এমনকি আমার বাবাও না। তবে এটুকু হয়তো করতেন, তা হল মাকে জানাতেন। এটা শুধু জানানোর জন্যই। অনেকটা ভারি গলায় বলতেন, শুনো, বিয়ের পর আমার দাদা আমাদের সাথে এসে থাকবে। অথবা বলতেন, শুনো, বাচ্চা হবার পর আমার দাদা এখানে এসেই থাকবে। তবে এ বলতে পারতেন, শুনো, বিয়ের পর দাদা আমাদের সাথে থাকুন। কি বলো? নাহ! এ বেশি আবদার হয়ে যায়।

 

এ ভাবতে ভাবতে মনে হল, আজ অন্তত ভাবনা বন্ধ করতে হবে। কারণ নেশাটা এখনো লেগে আছে। বিরক্তিকরভাবে সবকিছু ভাবছি। এমন অন্যদিন হতো না।
এটা ঠিক যে এ আমি বহুদিন আগেই বুঝেছিলাম যে, আমরা অনেক কিছুই ভাবতে পারি কিন্তু সব কিছু করতে পারি না। মনে হল, এই আমরা শব্দের জায়গায় আমি শব্দ ব্যবহার করাই ভাল। কারণ এমন কেউ থাকা অস্বাভাবিক নয় যে, যারা যা ভাবে সবই করতে পারে
। যদিও সে বিষয়েও আমি অনিশ্চিত। তবে পৃথিবীতে আমরা কোন কিছুরই নিশ্চয়তা দিতে পারি না, এ ভাল করেই জানি। অনিশ্চয়তার প্রতিও নিশ্চয়তা দিতে পারি না।

ফোন রাখার আগে ঝুমা যে আমাকে গোছল করে খেয়ে নেয়ার কথা বললো তার সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি। কিছুদিন ধরেই এটা সে শুরু করেছে। আমি তার কথামতো তা করছিও। কারণ এটাকে মানিয়ে নিতে হবেই। মাঝে মাঝে অবশ্য আমার মনে হয়েছে, আমি যদি তার কথামতো কিছু না করি তবে কী হবে? কিন্তু করলেও তেমন আহামরি কিছু হবে বলে মনে হচ্ছিল না। তদুপরি, ভালবাসার এই অত্যাচারটা ভালই লাগছিল। তবে নিজেকে এ প্রশ্ন যে করিনি তা না, এই যে ভাল লাগা তা কি নতুন নতুন তাই? মনে হয়েছে, তা হলেই বা কী? এই ভালো লাগাটা তো আর ফেলনার নয়!

বিকেলে যখন বের হলাম তখন আজব এক চিন্তা মাথায় ঘুরতে লাগলো। বের হবার আগে কিছুক্ষণ বসে বসে টিভি দেখেছি। তার আগে খেয়েদেয়ে মায়ের সাথে কথাও বলেছি। তবে যা ভাবছি তা এসবের সাথে কোনোভাবেই খাপ খাচ্ছে না। তবে আমি ভেবেই যাচ্ছি। এ ভাবার পরও যে, এই আজব ভাবনা কোথা থেকে আসলো? কিন্তু কোথা থেকে আসলো তার খোঁজার খুব একটা চেষ্টাও করছি না। শুধু ভেবেই যাচ্ছি। ‘এমন যদি হয় পৃথিবীর সব মানুষ একসাথে ঘুমিয়ে গেল। সব বলতে একেবারে সব। কেউ কোথাও জেগে নেই। কারো কোন কাজ নেই। সবাই ঘুমোচ্ছে। এমনকি দিনের আলোরও পরোয়া করছে না। এরপর সবাই একসাথে স্বপ্ন দেখা শুরু করলো। স্বপ্নে এমন দেখা শুরু করলো যে তাদের যার যা করার কথা ছিল তাই করছে।’ এ পর্যন্ত ভেবে আমি হা হা হা করে উচ্চস্বরে হেসে উঠলাম। দেখলাম রাস্তার অনেকেই আমার দিকে তাকাচ্ছে। আমি চুপ মেরে গেলাম। তবে ভাবতে লাগলাম। মনে হল, ‘এর পর আর কেউ ঘুম থেকে জেগে উঠলো না। তারা স্বপ্নই দেখতেই লাগলো। দিনের পর দিন কেটে গেল, যুগের পর যুগ।’

এ ভাবতে ভাবতে হাসতে লাগলাম। খুব ভাল লাগছে। ইচ্ছে হলো আরও কিছু ডালপালা ছড়ানো যাক। কিন্তু তাতে ব্যাঘাত ঘটলো। হঠাৎ কে যেন আমার কাঁধে হাত রাখলো। আমি পেছন ফিরে তাকাতেই তিনজন লোক আমাকে ঘিরে ধরলো। এমন যে যদি আমি দৌড়াতে চেষ্টা করি। ভাবলাম, আজ তো আমার কাছে ভাল পরিমান টাকাই আছে। তবে চাইলেই দিয়ে দেবো। অন্তত এ বলবো না যে, আমি কাদেরের জন্য টিভি কিনতে যাচ্ছি। টাকাটা এখন দেয়া যাবে না।

কিন্তু লোকগুলো টাকা চাওয়ার পরিবর্তে আবদার করলো আমাকে তাদের সাথে যেতে হবে। এটাকে আমার কাছে সাধের আবদারই মনে হল। বলা নেই কওয়া নেই এসে বললো আমাকে যেতে হবে। তবে তা আমাকে খুব বেশি একটা অখুশি করতে পারলো না। আমি বললাম, চলুন, কোথায় যেতে হবে। তবে টাকা চাইলে এখানেই দিয়ে দিতে পারি।

আমার কথায় তাদের খুব একটা খুশি মনে হচ্ছিল না। তবে এমন নয় তাদের মোটা মোটা তৈলাক্ত কপালে ভাঁজ পড়াতে সক্ষম হল। একজন শুধু আমার ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে সামনে এগোতে বললো। একজন আমার সামনে সামনে হাঁটছে। বাকি দুইজন পেছনে। দৃশ্যটা আমার কাছে খুব একটা খারাপ লাগছে না। এটা ঠিক এক ধরনের ভয় ভয় কাজ করছে। যদিও আমার উচিৎ ছিল আরও বেশি ভয় পাওয়া। তবে এটাও ঠিক কোন প্রশ্ন করতে আমার ভয় হচ্ছিল। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল, এখন কোন প্রশ্ন করলেই এদের যে কেউ একটি ঘুসি বসিয়ে দিতে পারে। তা শরীরের যেকোন জায়গায় হতে পারে। মনে হচ্ছিল এরা নির্ঘাত নিয়মিত মায়ের হাতের রান্না খায়। নয়তো এমন মোটাতাজা হল কীভাবে! এমনও হতে পারে, বিয়ের পর নিয়মিত বউয়ের হাতের রান্নাও খায়। অন্তত তারা যে হোটেলের খাবার খায় না, এ বিষয়ে নিশ্চিত হলাম। এটা নিশ্চিত হতে পেরে খুব ভাল লাগছিল। এমন যে আমাকে যে হঠাৎ তিনজন লোক জোরপূর্বক নিয়ে যাচ্ছে তা ভুলতেই বসেছি।

কিন্তু হঠাৎ যখন একটি কালো গাড়ির সামনে এসে একজন দরজা খুলে বললো, ভিতরে ঢুকুন, মনে হলো ভয়াবহ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। ইচ্ছে হল, একটি ঘুম দেই। তবে অবশ্যই মায়ের কোলে মাথা রেখে। এমন অসহায়তা ঝুমার কোলে মাথা রেখেও দূর করা যেত না হয়তো। আমরা কি ততো সময় পেয়েছি একে অন্যের জন্য? ততোটা নিরিবিলি জলে ভয়হীন?

তাদের একজনের কোমরে গোঁজা পিস্টলটা আমি যখন ঘাড়ে স্পর্শ পেয়ে ঘুরে দাঁড়াই তখনই দেখিয়েছিল। গাড়িতে উঠতে উঠতে আমি এই বিষয়টা নিয়ে ভাবলাম। ভাবলাম, বাহ! আমি চাইলেই যে খুন হতে পারতাম! কিন্তু কেন তেমন কিছু ইচ্ছে হলো না? চাইলেই তো আমি আমার বাসার ইঁদুরগুলোর মত একটি দৌড় দিতে পারতাম। ভাবলাম, এত ছোট ছোট পা নিয়ে ইঁদুরগুলো এমন দ্রুত দৌড়ায় কীভাবে?

লোকগুলো আমার সাথে আর একটি কথাও বললো না। তিনজনের একজন গাড়ি চালকের সাথে, বাকি দুইজন আমার দুইপাশে চুপচাপ বসে রইলো। আমি অবশ্য বারকয়েক তাদের দিকে তাকিয়েছি। তবে এমন গোমড়া মুখ আমার একদমই ভাল লাগেনি। আমি চেয়েছি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে কিন্তু আমাকে যেহেতু মাঝখানে বসতে দেয়া হয়েছে তাও করতে পারছি না। তাই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভাবতে লাগলাম। হঠাৎ নিজেকে প্রশ্ন করলাম, এরা যেহেতু টাকার জন্য আমাকে ধরেনি। এমনকি আমার মোবাইলটিও চাচ্ছে না, তবে কেন ধরলো? এমন কি হতে পারে আমি ঐরকম আজব বিষয় নিয়ে ভাবছিলাম বলে হঠাৎ উদয় হলো। আমি ওদের কি এটা বলতে পারি যে আমি আসলে এমনিই ভেবেছি। আর এটাও যে, আসলে আমি যে বলছি, মানুষ সব ঘুমিয়ে আছে আর স্বপ্ন দেখছে যা তাদের করার কথা ছিল। এটা দিয়ে আমি অন্তত এটা বলতে চাইনি, বর্তমানেও মানুষ ঘুমিয়ে আছে। এবং স্বপ্ন দেখছে, আসলে তারা যা ভেবেছিল তাই ঘটছে। সব ঠিকই ঘটছে। এরা আর জাগবে না।

এ নিয়ে আমি এতো বেশি উৎসাহী হয়ে উঠলাম যে, তাদের বলতেই গেলাম। কিন্তু তারা এমন ভাবে তাকালো যে আমি থেমে গেলাম। কিছু না বলে একজন প্রথমে আমার মুখ বেঁধে দিল। এরপর অন্য একজনের ইশারায় চোখও বেঁধে দিল। প্রথমে আমি খুব দুঃখ পেলাম। এই ভেবে যে এখন থেকে হয়তো এমন অন্ধই থাকতে হবে। হঠাৎ মনে হলো, ভাগ্যিস তারা আমার মনটাও বাঁধতে পারেনি। আমার ভাবনাকেও না। এ ভেবে মন অনেক ফুরফুরে হয়ে উঠলো। মনে হল, যাহ! এই ভোরের আলো চোখে এসে পড়লো। তবে বলে উঠতে চাইলাম, নাহ! মনে এসে পড়লো। কিন্তু বলতে পারলাম না। কারন মুখ বেঁধে রেখেছে!

হঠাৎ ঝুমার কথা মনে পড়লো। সে কি আমাকে ফোন দিচ্ছে! অনেক দিন পর আজ আবার মোবাইলটা না নিয়েই বের হয়ে গেছি। এখন মনে হচ্ছে, না এনেই ভাল করেছি। এইলোকগুলো দেখা যেত নিয়ে নিত। তবে এটা ঠিক তারা এখনো আমার কাছে কিছু চায়নি। কিন্তু চাইতে কতক্ষণ? যারা হঠাৎ উঠিয়ে নিয়ে আসতে পারে, তারা সবই করতে পারে। মনে হলো, এই ভাবনাটা কেমন যেন নিরাশ মানুষের মত। তাতে হলোই কি? নিজেকেই প্রশ্ন করলাম। আমি নিঃসঙ্গতা ভালবাসতে পারি কিন্তু কোনভাবেই নিরাশ নই। নিজেকে শুনিয়ে দিতে চাইলাম। তবে এবার আর কথা বলতে চেষ্টা করলাম না। মনে মনেই শোনালাম।

এখন আমি কী করতে পারি? এটা আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিল। এটা জানি আমি চাইলেই এদের থেকে মুক্তি পাবো না। এরা যেহেতু নিজের ইচ্ছেতেই আমাকে ধরেছে, ছাড়বেও তাদের ইচ্ছেতেই। কিন্তু আমি কি কিছু করতে পারি? যেমন যখন গাড়ি থেকে নামতে বলবে তখন দৌড় দেবো। আমি তো অনেক ভাল দৌড়াতে পারি। দৌড়ানোর জন্য স্কুল কলেজে আমি পুরস্কারও পেয়েছি। কিন্তু তাদের কেউ যদি পেছন থেকে গুলি করে দেয়? মনে হল এ ভয়টা খুব বড় ধরনের। এমন খবর তো অনেকই শুনেছি, এভাবে দৌড়াতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে সন্ত্রাসীর। কিন্তু আমাকে তো কোনোভাবেই সন্ত্রাসী বলতে পারছি না।

অন্য কোন কাহিনী মনে করার চেষ্টা করলাম। এমন যে, সন্ত্রাসীর হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে যুবকের মৃত্যু। তবে আমার জানা মতে এমন কোন ঘটনা মনে পড়লো না। তবে চাইলেই এমন ঘটনা নিয়ে ভাবতে পারি। দেখা যাবে তখন ভাবনা ধীরে ধীরে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করতে শুরু করেছে। এ নিয়ে ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম। এমন সময় ঘুম কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। কিন্তু কি আর করা, চোখ বাঁধা থাকার কল্যানেই একসময় ঘুম চলে আসলো। তবে জেগে উঠার পর ঘুমটা আমার ভালই লেগেছে।

হঠাৎ ঘাড়ে প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে আমার ঘুম ভাঙলো। আঘাতটা এত জোরে ছিল যে সাথে সাথেই আমি বুঝতে পারলাম, এরা নির্ঘাত পুলিশ বা র‍্যাব। এটা আমি খুব ভাল করেই জানি, এমন মারায় তাদের খুব খ্যাতি আছে। তা তারা যাকেই ধরুক না কেন! এতক্ষণ যেহেতু এ বিষয়ে অনিশ্চিত ছিলাম তাই ভয়টা কম হচ্ছিল। কিন্ত এখন যেহেতু বুঝে ফেলেছি আমাকে কোন কারনে পুলিশ বা র‍্যাব ধরেছে তাই খুব ভয় পেয়ে গেলাম। কিন্তু কেন তারা আমাকে ধরলো! এর কোন কূলকিনারা করতে পারলাম না।

কি কারণে জানি না, তারা আমাকে আঘাত দিতে দিতে গাড়ি থেকে বের করলো। তারপর হাতে হাতকরা পরিয়ে দিল। কিন্তু আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। কোথায় আছি? কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে! কিছু না।

এমন যে আমাকে ঠিক মত ভাবতেও দিচ্ছে না। কি কারণে জানি না খুব খেপে গ্যাছে। কেউ একজন খুব ভাল ভাবেই আঘাত করছে। এমন যে কতদিন কাউকে সে মারে না! আজ পেয়েছে! হঠাৎ আমার বাড়িয়ালার কথা মনে পড়লো। ছেলেবেলা সে কি মারটাই না খেয়েছে! তারপর হঠাৎ মমতায় মনটা ভরে উঠলো। খুব মায়া হতে লাগলো লোকটার প্রতি। এজন্যও যে তার ছেলেমেয়ে গুলো এখন সবাই দূরে দূরে থাকে। শুধু সেই যেতে পারলো না!

কিন্তু কেউ আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলো না। এমন যে আগে আগে কিছু বলার বা জিজ্ঞাসা করার কোন রীতি নেই। আগে অবশ্যই মেরে মেরে কাহিল করে নিতে হবে। যাতে অন্তত পালানোর শক্তি না পায়! তবে এটা ঠিক আমি পালানোর চিন্তা করেছি। ভেবেছিলাম, গাড়ি থেকে বের হবার সময়েই দৌড় দেবো। কিন্তু এটা ভেবে পাইনি তারা আমাকে মেরে মেরে বের করবে। এবং বের করেও মারতে থাকবে। তাছাড়া ঘুমিয়ে যাবার ফলে তেমন কোনো পরিকল্পনা করতে পারিনি।

মার খেয়ে আমার ধরাশায়ী অবস্থা। বলতে গেলে দাড়ানোর শক্তি নেই। কিন্তু চিন্তাশক্তি আছে। ভাবনারা থেমে নেই। তবে সবই তালগোল পাকানো। এই ঝুমার কথা মনে হচ্ছে তো এই মায়ের কথা। এই বাড়িয়ালার কথা। পাপিয়ার কথাও। কিন্তু কোনোভাবেই এ বিষয় নিয়ে তেমন ভাবতে পারলাম না যে, কেন আমাকে ধরা হল। হঠাৎ কাউকে বলতে শুনলাম, ‘শুনো একে ঘরে বন্দি করে রাখো। স্যার, এখন আসতে পারবেন না। সকালে আসবেন। রাতের খাবারটা দিয়ে দিও।’

কিন্তু অন্যজন কিছুটা চিন্তিতই। বলতে শুনলাম, একে তো জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার। আমি তো শুনেছি বিষয়টা খুব জরুরী।

কিন্তু কি যে হল সবাই চুপ মেরে গেল। তারপর কেউ একজন আমাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। তবে প্রথমে দাঁড় করিয়ে নিল। আমি এতে খুশিই হলাম। চাইলে শুইয়ে টেনে নিতে পারতেন। তখন আমার অনেক বেশি কষ্ট হত। তবে আমি খুব ভাল হাঁটতে পারছিলাম না। একে চোখ বাঁধা, তার উপর শক্তি নেই। আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না হঠাৎ সবাই চুপ মেরে গেল কেন। তাছাড়া, যেহেতু কিছু জিজ্ঞাসা করছে না, তার মানে কি বিষয়টা যত জরুরী ভাবছিল ততটা জরুরী না? তবে কোন জরুরী বিষয়ে আমাকে গ্রেফতার করা হতে পারে তা নিয়ে আমি ভাবতেই চাইলাম না। শুধু এই বিষয়টা আমার কিছুটা ভাল লাগলো যে, যে জন্যই আমাকে গ্রেফতার করা হোক সেটা খুব একটা জরুরী বিষয় আর নেই।

কিন্তু যখন আমাকে একটি কক্ষে এনে চোখ খুলে দিয়ে, এক বোতল পানি দিয়ে ঘরটা তালা দিয়ে চলে গেল, ভাবলাম, স্যারের এই না আসার অন্য কারণও থাকতে পারে। পানি দিয়ে যাওয়ায় আমি লোকটার দিকে খুব কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকালাম। তবে ভাবলাম, ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি হলে আরো খুশি হতাম। কিন্তু দুখের বিষয় হল, বাইরে গিয়ে লোকটা লাইট বন্ধ করে দিল। পুরো কক্ষ অন্ধকার হয়ে গেল। শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে একটি আলোর রশ্মি ঢুকছে। মনে হল এই রশ্মি নিয়ে ভাবার সময় অনেক পাওয়া যাবে। সবার আগে পানি খাওয়া খুব দরকার।

পানি খেতে খেতে বুঝলাম, সেই দিন শিক্ষক ও বাবা দুইজনে যে পরিমাণ মেরেছিলেন, আজকের সাথে তার তুলনাই চলে না। আজ অন্তত দুইশ বিশ গুণ বেশি। কিন্তু আজ আমি গাছেও উঠিনি। কাউকে ভালবাসি বলে চিৎকারও করিনি। তবে এই সময়ে এমন ভাবনা বড় ধরনের বোকামি তা সাথে সাথেই বুঝলাম। মনে হল এর থেকে ভাবা যেতে পারে কেন স্যার আসতে পারলেন না। তাছাড়া এমন বিষয় কেন একজনের তত্ববাধানেই সব কিছু?

একটা বিষয় ভেবে খুব মজা পেলাম, এমন হতে পারে স্যার আজকে গেছেন তার শ্যালিকার বিয়েতে। শ্যালিকার বিয়েতে তো তাকে যেতেই হবে। এমন যে গায়ে হলুদের দিন যেতে পারেননি। স্ত্রী বলেছে, আজ যদি যথা সময়ে না যায় তবে তালাক দিয়ে দেবে। স্যার অবশ্য এই মাঝ বয়সে তালাক খেতে চাচ্ছেন না। তাই যত কাজই থাক তাকে যেতেই হল। আর শেষে যাবার পর শ্যালিকা তাকে আসতেই দিলো না। এমন হতে পারে মাঝরাত পর্যন্ত পার্টি হবে। তারপর শ্যালিকা শ্বশুর বাড়ি যাবে। কিন্তু এখনো মাঝরাত হয়নি!

ভাবনাটা আমার ভাল লাগলো। কারন আমি অবশ্যই ঝুমাকে নিয়ে ভাবতে চাচ্ছি না। কারণ, ভাবলেই ওর কান্নার কথা মনে পড়ে। মায়ের কথাও না। ঐ সব ভাবলে একটি বিশৃঙ্খল অবস্থার কথা মনে পড়ছে। যা আমি কোনোভাবেই চাচ্ছি না। আমি চাইলাম স্যারকে নিয়ে আরো কোন গল্প বানাতে। যা নিয়ে বহুক্ষণ ভাবা যাবে। যাতে সময়টা খুব ভালোয় ভালোয় চলে যায়। তবে এ ঠিক নিজেকে মাঝে মাঝে এমন দুর্বল মনে হচ্ছিল, মাঝে মাঝেই ঝুমাকে চুমু খেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু আমি ঐ স্যারের শ্যালিকার কথা ভাবতে চাইলাম, ভাবলাম, শ্যালিকার সাথে তার প্রেম ছিল। কিন্তু বউয়ের কারনে কোনোভাবেই সেই প্রেমকে বাস্তবে রূপ দিতে পারছেন না। তা শুধু স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে। আজ সেই শ্যালিকার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। তাকেও সেখানে যেতে হয়েছে। তার প্রেমকে অন্যের হাতে তুলে দিতে হয়েছে। তাই এখন কোথাও বসে বসে মদ গিলছেন।

এ ভাবতে ভাবতে উচ্ছস্বরে হেসে উঠলাম। বহুক্ষণ ধরে হাসলাম। ভাবলাম সে যেই হোক যে তাকে এভাবে বন্দি করে রেখেছে, তাকে খুব জব্দ করা গেল। তবে কিছুক্ষণ হাসার পর নিজেকে বোকা বোকা লাগলো। তবে তাতেও খারাপ লাগলো না। অন্তত জীবনের সরলতায় নিজেকে ভাসিয়ে দিতে পারছি।

অবশ্য আর কোন গল্প বানালাম না। হঠাৎ কিছু ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল এখন ঘুম চলে আসলে খুব হয়। কিন্তু তা আসলো না। বার বার ঝুমার কথা মাথায় আসতে লাগলো। যদিও চাচ্ছি না। ও কি খুব খোঁজ করছে? এখন কি বাসায় গ্যাছে? মাকে কি ফোন দিয়েছিল? মা ওকে কী বলেছে? মা কি বলেছে, ‘ঠিক আছে। তুমি ফোন দিয়েছ তাতেই আমি খুশি। এখন তোমরা যখন ইচ্ছে বিয়ে করো’?

মা কী বলেছে আমার বিষয়ে? এমন কি বলেছে, ‘ছেলেটা কেন জানি ধীরে ধীরে লাজুক হয়ে উঠেছে! ছেলেবেলা কিন্তু এমন  ছিল না?’

এখন মা কি জেনেছে আমার এমন উধাও হবার খবর? বাবা কী বলেছে শুনে? দাদাও কি শুনে ফেলেছে এতক্ষণে? গ্রামের সব মানুষ? অথবা কাদের?

আমি এর কোন উত্তরই ভেবে পাচ্ছিলাম না। একটি কেমন যেন বিশৃঙ্খল অবস্থা আমার চোখের সামনে ভাসতে লাগলো। এমন কোনদিনই চাইনি। তবে এ জানি পরিকল্পনায় জীবন ঠিক চলে না। এটা তো ঠিকই আমি পরিকল্পনাও করিনি। তবে বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে চলতে চেয়েছি।

আমার মনে হল, অন্য কিছু নিয়ে ভাবা উচিৎ। ভাবলাম, কাল যখন আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করবে তখন শুধু হাসবো। কোন উত্তর দেব না। খুব আনন্দের সাথেই হাসবো। যদিও জানি না, তারা কী জিজ্ঞাসা করবে। তারা কি এমন কিছু বলবে আমি অফিসে খুব বড় পরিমানের ঘুষ নিয়েছি? সেটা তো আমি কখনোই করিনি। তবে নিতে দেখেছি। চাইলে আটকাতেও পারতাম কিন্তু আটকাইনি। কেন? এর তেমন কারণ নেই। মনে হয়েছে, ওটা আমার কাজ না। আমি শুধু আমার কাজ করতে চেয়েছি। এটা কি কোন অপরাধের মধ্যে পড়ে?

তা হতে পারে। কারণ অপরাধীকে ধরিয়ে না দেয়া অপরাধের মধ্যে পড়তে পারে। কিন্তু আমার এ মনে হল না, ঘুষ খাওয়ার কারণে কারো কিছু হয়েছে। তারা তো দিব্যি খেয়ে যাচ্ছে! এমনকি ঠিক মতো কাজও করছে না। আমিই করে দিচ্ছি। তবে আমাকে ধরতে আসবে কেন? তারা কি খোঁজ না নিয়েই আমাকে ধরেছে? নিজের মনে এক ধরণের বিশ্বাস জন্মাতে লাগলো সকালেই এরা আমাকে ছেড়ে দেবে। মনটা খুশি হয়ে গেল। হঠাৎ মোজার্টের একটি বাঁশির সুর বাতাসে ভাসতে লাগলো। অন্তত আমার মনে হল। আমিও ঠোঁট দিয়ে তাল মিলাতে শুরু করলাম। খুব ভাল লাগছে। খুব ভাল। দেহে যেন শক্তি ফিরে পেলাম।


— End —

About the Author

Sham Pulok