অধ্যায়-৩: বিনিময়
Excerpt
আমার কথায় সে হাসলো। বললো, আমরা যদি আরো কিছুদিন পর বিয়ে করি? ‘কতদিন?’ আমি প্রশ্ন করার আগেই সে বললো, মানে বছর দুই। কারণ তো তুমি বুঝোই। আমার কাজ! এই মুহুর্ত বিয়ে হলে সব এলোমেলো হয়ে যাবে। আমি কিছু একটা বলতে গিয়ে গুছিয়ে উঠতে পারলাম না। বলতেই পারলাম না, ঠিক আছে। তা কোন সমস্যাই না। এটা কি কোন ভয়ের কারণে? আমি তাও বুঝলাম না। শুধু হালকা হাসলাম। বুঝতে পারলাম, এর মানে এখন সে এই বিষয়টা কাউকে জানাতেই পারবে না যে, তার একজন প্রেমিক আছে। সেই প্রেমিকটা কোন মিডিয়ার সৃষ্টি না, সত্যিই প্রেমিক। বিষয়টা হঠাৎ করে আমার কাছে হাস্যকর মনে হতে লাগলো। কেন আমি ঠিক বুঝলাম না। আমি একদম চুপ হয়ে গেলাম। আমাকে চুপ থাকতে দেখে সে আমার হাত তার হাতে নিলো। কেন যে বলে উঠলো, তোমার কি ভয় হচ্ছে? এটা আমাকে খুব ভালভাবেই আঘাত করলো। ইচ্ছে হল গাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। এক অদ্ভুত অভিমান আমাকে গ্রাস করলো। যাকে কোনোভাবেই সংজ্ঞায়িত করতে পারলাম না। আমি কেন জানি তার হাতদুটি চেপে ধরলাম। নিজেকে অসুস্থ মনে হল। এই বিষয়টা আমার কল্পনাতীত ছিল, কেন এমন হচ্ছে। কিন্তু কিছু বলতে পারছি না।
বিনিময়
হঠাৎ একদিন বিকেলে অফিস থেকে বের হয়ে দেখি অফিসের সামনে ঝুমার গাড়ি। দেখে খুব ভাল লাগলো। এ ভেবেও ভাল লাগল গাড়িটা দেখেই আমি চিনতে পেরেছি। আমি কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই ঝুমা আমাকে গাড়িতে উঠতে বললো। আমি কিছু না বলে গাড়িতে উঠে গেলাম। উঠে তার দিকে তাকিয়ে আমি ভড়কে গেলাম। মনে হল এইমাত্র সে একটি কান্নার দৃশ্যে অভিনয় করে বের হয়েছে। কি বলবো ভাবার আগেই সে বলে উঠলো, আমাকে বিয়ে করবে?
এমন প্রশ্ন শুনে আমি তার দিকে তাকালাম, দেখি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে অনেকটা জিদের বসে আমাকে এই কথা বলছে। মনে হল এই কথা আমার বলার কথা ছিল। কিন্তু আমি কেন বলিনি, এ নিয়ে খুব রাগ তার। আমার ইচ্ছে হলো বলি, আমি কবে মানা করছি? কিন্তু তা না বলে তার দিকে তাকিয়ে হাসলাম। কিন্তু আমার মনে পড়লো খবরের কাগজে প্রায়ই ওর প্রেমের খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে তা সত্য না মিথ্যা আমি কখনোই ভাবতে যাইনি। কিন্তু আজ মনে হল তেমন কিছু সত্য হতেও পারে। কিন্তু সে আবার বলে উঠলো, কি? কিছু বলছো না যে? আর এতদিনেও একবারো আমার কাছে গেলে না যে? আগে যাওনি, কিন্তু সেদিনের পরে তো যেতে পারতে?
আমি খুশি
হলাম। কিছু একটা বলার সুযোগ পেয়েছি। ‘তুমি তো আসবে বললে। আমি তো অপেক্ষা করছিলাম।’
সময়ের অপচয় না করে সাথে সাথেই বলে ফেললাম। আমার বলার ধরন দেখে সে এতক্ষণে জোরে
হেসে উঠলো। বললো, ‘চলো কোথাও ঘুরতে যাই?’
ঘুরতে আমার ভালই লাগে। আমার তেমন মানা নেই, ভাবলাম আমি। বললাম, চলো। কোথায় যাবে?
‘সিরাজগঞ্জের দিক। সেখানে আমার জানা একটি হোটেল আছে। সেখানে রাতের খাবার খেয়ে ফিরে আসব।’ ঝুমা বললো। এতক্ষণে তাকে স্বাভাবিক লাগছিল। কেন এমন অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল বুঝলাম না। আমি যেদিন গাছে উঠে চিৎকার করেছিলাম আমার তো তেমন হয়নি! আমি তো খুব স্বাভাবিক ভাবেই চেঁচিয়েছিলাম! এসব নিয়ে আমাকে তেমন ভাবতে দিল না। বললো, কি আজ চুমু খাবে না! আজ তো আমি বিয়ে করতে পর্যন্ত রাজি।
এবার সেদিনের চুমুর জন্য নিজেকে ভর্ৎসনা করা শুরু করলাম। এ কথা শোনার পর আমি তার দিকে তাকাতেই পারলাম না। ঝুমা ওর দুহাত দিয়ে আমার মুখ ধরে রাখলো যাতে আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। তারপর হাসতে হাসতে বললো, গাছের উঁচু ডাল থেকে চিৎকার করা হয়েছিল, তাই না? আমি তোমাকে ভালবাসি। আমি তোমাকে বিয়ে করবো। এখন এমন লজ্জা কেন?
আমার এমন অদ্ভুত লাগছিল যে বলেই ফেললাম, ভুল হয়েছিল। ক্ষমা করে দাও। বলেই নিজেকে এত বোকা লাগলো যে ওর হাতদুটি দিয়েই নিজের মুখ ঢাকলাম। তারপর বহুক্ষণ চুমু খেলাম। ভাবলাম, ছেলেবেলায় কিন্তু এমন কোনোদিন ভাবিনি, এভাবে গাড়িতে বসে চুমু খাবো। একসময় আমার হাত যখন ওর পিঠ থেকে বুকের দিকে যাচ্ছিলো নিজেকে সে সরিয়ে নিল। তারপর হেসে আমার দিকে তাকালো। বললো, আমি যতকিছুই করেছি তোমার সেই হাসি মাথা থেকে সরাতে পারিনি। প্রথম দিকে যদিও ভয় পেতাম। কিন্তু এক সময় তা ভাললাগায় রূপ নিল।
এ কথা শুনে হঠাৎ আমি হেসে উঠলাম। সেই ছেলেবেলার মতই উচ্চস্বরে। ও হাত দিয়ে আমাকে থামিয়ে দিল। তারপর নিজেও হাসতে লাগলো। বললো, আমার ভাবতে অবাক লাগছে আমরা কীভাবে এতদিন এত দূরে দূরে থাকলাম!
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললো, ‘আসলে তোমার জন্য। তুমি আমাকে জানতেই দাওনি এখনো আমাকে চাও। তাছাড়া সেদিনের পরে আমাদের দেখাই হয়নি। আমি ভেবে পাইনি তুমি যে ছেলেমানুষী করেছিলো তার কোনো অর্থ এখনও বর্তমান কিনা, বা এর ঠিক শেষ কোথায়? তাছাড়া জীবন তো আর সেই শৈশবের ইউটোপিয়া না, যার যাপিত বিস্তারের নিজেদের ছেড়ে দিতে পারি’ ওর কথা আমার খুব ভাল লাগছিল। কিছুটা বোকাটে ভাব মনের মধ্যে দৌড়াচ্ছিল। আমি ওর হাতের আঙুল নিয়ে নাড়তে লাগলাম। কিছু বললাম না। অনেকটা ঘোরের মধ্যে আমার সময় কাটছিল। এমন এক বোধ যাকে কোনভাবেই সুখ বলা যায় না। এ সুখ থেকে অনেক উপরের কিছু। তবে ঠিক কী আমি জানি না।
এটা কি স্বপ্ন পূরণের আগমুহুর্ত? নিজেকে প্রশ্ন করলাম। এমনও হতে পারে স্বপ্ন পূরণ হয়ে গ্যাছে। কিন্তু আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। হয়তো রাতে যখন বাসায় ফিরে যাবো তখন বুঝতে পারবো। ‘রাতে কি বাসায় ফিরে যাবো?’ আবার প্রশ্ন ছুড়লাম। তা আমি এখনো ঠিক জানি না। যেখানে গাড়ি খুব ভাল গতিতেই চলছে তখন যেকোনো জায়গায় যেতে পারি। তবে আমি তো জানি কোথায় যাচ্ছি! কিন্তু সেখান থেকে তো যেকোনো জায়গায় চলে যেতে পারি! ভাবলাম যখন খেয়েদেয়ে ঝুমা ফেরার কথা বলবে বলবো, চলো পালিয়ে যাই!
এ কথা ভাবছি বলে নিজের কাছে বিরক্ত লাগলো। আরে! আমি কি সেই কিশোর ছেলেটি আছি নাকি যে চিন্তা করতো একদিন চুরি করে পালিয়ে চলে যাবে! তবে যেহেতু ঝুমার হাত আমার কাছে ছিল এবং আমি তা আমার মুখে ঘষছিলাম তাই ধীরে ধীরে সব ভাবনাই ভাল লাগলো। সে আপনমনে কিছু একটা ভাবছিল। আর মাঝে মাঝে গুনগুন করছিল। তবে সুরটা আমি ঠিক ধরতে পারলাম না। হঠাৎ সে বলে উঠলো, আমি কিন্তু সেদিন মোজার্ট শুনেছি। কিছু সুর খুব ভাল লেগেছে। বিশেষকরে পিয়ানোর কয়েকটি সুর। আমিও বাজাতে চেষ্টা করেছি। তোমাকে একদিন শোনাবো।
তার কথা শুনে হেসে আমি বলে উঠলাম, তুমি পিয়ানো বাজাতে পারো? এই প্রশ্নটা আমার অসম্ভব লাগলো। এই শহরে কেনো একজন মানুষ পিয়ানো বাজাতে পারবে?
‘হুম। আমি তো সেই ছেলেবেলাতেই শিখেছি। তবে খুব একটা ভাল পারি না। কিন্তু তোমাকে খুশি করতে পারবো বলেই মনে হয়। আর আমার তাতেই হবে।’ হাসতে হাসতে বললো সে।
আমি ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। পরে মনে হল এটা বোকামি। তাই চুমু খেলাম, প্রথমে হাতে, তারপর ঠোঁটে। ও তাতে সারা দিল, তার ভঙ্গীটাও অদ্ভুত। ভাবলাম এটা কি কোথাও থেকে ধার করা হতে পারে? তা হতে পারে। কিন্তু আমি জানি না। এ ভেবেই মনে হল, এমন ভাবনা খুবই অন্যায়। মারাত্মকভাবে অন্যায়।
এরপর আমরা আমাদের পরিবার নিয়ে কথা বললাম। এ নিয়েও আলোচনা করলাম যে কেউ কি এমন আছে যে আমাদের বিয়েতে রাজি হবে না! যদিও আমরা জানি, এটা শুধু আলোচনার জন্যই আলোচনা। কেউ রাজি না হলেও আমরা বিয়ে করবো। আসলে কেউ আমাদের বিরুদ্ধে কথাই বলতে পারবে না। ঝুমা যদি অভিনেত্রী না হয়ে অন্য কিছু হত তাহলে হয়তো তার পরিবার কিছু বলতে পারতো। অথবা তাদের ইচ্ছে মত বিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু এখন আর পারবে না। আর আমার কেউ চাবে না আমি তা জানি। এটা জেনেই খুশি হবে যে আমি বিয়ে করছি। তবে এ আলোচনার আর একটি কারণ ছিল। তা হল আমাদের তো কিছু একটা বলতে হবে। আমরা তো আর পুরো রাস্তায় চুমু খেতে খেতে চলতে পারি না? পারি কি? হয়তো পারতাম! কিন্তু সেটা নিয়ে আমার আর ভাবতে ইচ্ছে হল না।
হঠাৎ আমার মনে হল, আমরা কি সন্তান নিয়ে কথা বলবো? তারপর মনে হল, প্রথম দিনই এ নিয়ে কথা বলা বাজে শোনাবে। তাহলে আমরা বিয়ে কবে হবে এ নিয়ে কথা বলতে পারি। কিন্তু তাও আমার বলতে ইচ্ছে হল না। আমি চাচ্ছিলাম এসব নিয়ে ঝুমাই কথা বলা শুরু করুক। কিন্তু সে তা করলো না। সে আমার অফিসের কাজ নিয়ে প্রশ্ন করতে লাগলো। আমি ভয়ে ছিলাম আবার না বলে বসে চাকরি বদলাতে হবে। কিন্তু তা করলো না। আমি খুশি মনেই সব বলতে লাগলাম। বলেই বসলাম বাসায় আমি অলস হওয়া সত্তেও অফিসে খুব কাজ করি। কাজ না করতে পারলে বিরক্ত লাগে। শুধু শুধু বসে থাকতে পারি না। তাই অন্যের কাজ করেও হলেও সবাইকেই খুশি রাখতে পেরেছি।
কথা শুনে ঝুমা এমনভাবে তাকালো যে, এমন কথা সে আশা করেনি কোনভাবেই। আমারও মনে হল, কথাটা কেমন যেন বোকার মত। এ ঠিক, আমি প্রায়ই অফিসে আমাকে বোকা বলতে শুনি। কিন্তু এ নিয়ে তেমন মাথা-ঘামাই না। কারন কাজ করতে আমার ভালই লাগে। তাছাড়া কাজ না করে আর কিইবা করতে পারি! তবে একটি কাজ আমাকে বাধ্য হয়েই করতে হয় তা হল দেরি করে অফিসে যাওয়া। প্রথম কিছুদিন আমি যখন সময়মতো অফিসে গিয়েছি। সবাই এমন বলতে লাগলো, যেন আমি রীতিমত অপরাধ করে ফেলেছি। সবাই যেহেতু দেরি করেই আসতো। তাই আমার কারনে তাদের ঝামেলাই পোহাতে হচ্ছিল। তারা এ বলাবলি করছিল যে আমার কারনে তাদেরও একদিন আগে আগে অফিসে আসতে হবে।
তবে ঝুমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হেসে উঠেছিল। আমি তাতে খুশিই হলাম। বললো, খুব ভাল। আমাকেও সবাইকে মানিয়ে চলতে হয়। কিছুদিন পর হয়তো আর হবে না। তবে তুমি যেভাবেই চলো অফিসে আমার সমস্যা নেই।
তার কথা শেষ না হতেই বলে উঠলাম, তুমি চলে এলে তোমার কাজও করে দেবো। আমার কথায় সে এবার উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। আমিও হাসলাম। তবে এবার আর নিজেকে বোকা মনে হলো না। কিছুটা দুষ্টই মনে হল। আমার মনে হল, আমার ভবিষ্যৎ দিনগুলো খুব আনন্দেই কাটবে। কিছুক্ষণ পর ভাবলাম, আসলে আমার কোনদিনই খুব একটা খারাপ কাটেনি। আসলে আমি খুব একটা চাইনি খারাপ কাটুক। অথবা ভাল। আমি শুধু মেনে নিতে চেয়েছি। আর কিছুটা পরিশ্রম করতে চেয়েছি। কারন পরিশ্রম না করা একটি বিরক্তিকর ব্যাপার। স্থবিরতা আমি কোনদিনই মেনে নিতে পারিনি। একসময় মনে হল, এই এসময় এ ভাবনা কোনোভাবেই খাঁপ খাচ্ছে না। কি ভেবে হঠাৎ প্রশ্ন করলাম, তুমি অভিনয় শুরু করলে কেন?
আমার প্রশ্ন শুনে সে কিছুক্ষণ খুব হাসলো। আমি তার কারন বুঝলাম না। তবে চুপ করে উত্তরের অপেক্ষা করলাম। সে কিছুটা ছোট মেয়েদের মত করে বললো, তোমার জন্য। তুমি তো কান্না করতে শিখিয়েছিলে। কান্না করতে জানা তো অভিনয়ের প্রধান শর্ত?
সে এমন মজা করে বললো, প্রথমে আমি বিশ্বাসই করে ফেললাম। তারপর জোরে হেসে উঠলাম। ‘আসলেই?’
‘কলেজে হঠাৎ করেই শুরু করেছিলাম। সব সময় কান্না কান্না মুখ করে থাকতাম। তাই এক বান্ধবী আমাকে বাধ্য করেছিল। তারপর বিভিন্ন কারনে হয়ে গেল। প্রথম কারনটা তো তুমিই!’ এ বলে সে হাসতে লাগলো। আমি খুম মজা পেলাম। এক ধরনের ছেলেমানুষি আমোদে বলে ফেললাম, একদিন যদি এমন হয় আমি আরও বেশি কাঁদিয়ে...কিন্তু ও আমাকে থামিয়ে দিল। বলতে দিল না। তবে আমি তেমন অবাক হলাম না। হঠাৎ হাত দিয়ে ওর চোখ চেপে ধরলাম। তা কেন করলাম আমি জানি না। তারপর চুপ করে রইলাম। তা বহুক্ষণ। ও কিছু বললো না। একে অন্যের নিঃশ্বাসে নিজেদের ভিজিয়ে নিলাম। সে এক অসম্ভব অনুভূতি। অসম্ভব কেন? এর উত্তর আমার কাছে নেই।
কিন্তু থাকার কথা ছিল। যেমন আকাশে একটি চাঁদও থাকার কথা ছিল। আমরা যখন পৌছে গাড়ি থেকে বের হলাম দেখি তা নেই। কোন তারা আছে? আমি খুঁজলাম। তাও নেই। কারণ মেঘ ছিল। বৃষ্টি আসতেই পারে, আমার মনে হল। এ নিয়ে তেমন ভাবার সুযোগ পেলাম না। দেখি দুইজন লোক ঝুমার সাথে কথা বলছে। ঝুমা আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। আমাদের সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে গেল বলা যায়। আমার খুব ভাল লাগল। কিন্তু বিষয় হল যা আমার ভাবনায় আসলো, ঝুমা আর আমি হাত ধরে ভিতরে যেতে পারতাম। এমনকি কোমড় ধরেও যেতে পারতাম। কিন্তু মোটামুটি দূরত্ব বজায় রেখেই চললাম। খুব সুন্দর একটি জায়গায়ই আমরা বসলাম। বসার জায়গাটা যদিও খুব সুন্দর ছিল। কিন্তু আমি এই বিষয়টাই ভাবতে লাগলাম। ঝুমা কিছুটা অদ্ভুত চোখে বার কয়েক তাকালো কিন্তু কিছু বললো না। হঠাৎ মনে হল, বিষয়টা খুব সহজ। ঝুমা এখনি আমাদের বিয়েকে সংবাদপত্রের খবর বানাতে চাচ্ছে না। সে আমার দিকে তাকালো। মনে হল সে হঠাৎ আমার মুখে পরিবর্তন লক্ষ করেছে। আমি কিছু না বলে শুধু হাসলাম।
আমি মনে মনে ভাবলাম, আমরা কি এ নিয়ে কথা বলতে পারি যে কবে বিয়ে করবো? কিন্তু সেটা বলতে ইচ্ছে হল না। সেও বললো না। এর পরিবর্তে খাবারের অর্ডার করলো। তা বহুকিছু। চিংড়ি থেকে মাংস সব। আমার আপত্তি নেই। অফিস থেকে সরাসরি এসেছি। তাই ক্ষুধা ছিল খুব। আমার মনে হল এ জন্যই সে এত খাবারের কথা বলেছে।
বহুক্ষণ ধরে বসে বসে খেলাম। খাবার সময় আমি শুধু কথা বললাম খাবার নিয়ে। যেহেতু সে আমার খাবার সম্পর্কে কিছু জানতো না। তাই কি পছন্দ করি বা না করি সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো। আমি অবশ্য জিজ্ঞাসা করলাম না সে কি খেতে পছন্দ করে। আমি শুধু বলতে লাগলাম। এমন নয় যে কোন খাবার আমার অপছন্দ, তবে কিছু কিছু খাবার একটু বেশি পছন্দ। মনে মনে ভাবলাম, আমার তো শুকর বা কচ্ছপ খেতেও অনীহা নেই। তবে এসব বলতেই পারলাম না। অবশ্য মন চাচ্ছে বলেও মনে হল না। তবে আমি খুব খাচ্ছিলাম। তা খুব সতর্কভাবেই। আর খাওয়া দেখে ঝুমাকে খুশিই মনে হল। প্রতিটা মা যেমন চায় তার ছেলে রীতিমত পেটুক হোক, স্ত্রীও চায় তারা অন্তত ভাল খাক। তবে অতি পেটুক মেনে নেয় বলে মনে হয় না। আর ঝুমার মত মেয়ে তো মেনে নেবেই না। আমি মনে মনে ভাবলাম। এটা অবশ্যই একটা প্রতীকী ধারনা। হয়তো এমন নয় অযাচিত।
ফেরার সময় সে আমার বহুল কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নটা করলো। প্রশ্ন শুনে নিজের এত খুশি দেখে নিজেরই অবাক লাগলো। যেখানে আমি বিয়ের জন্য প্রস্তুতই ছিলাম না। তাছাড়া এমনও নয় যে আমি এর জন্যই আপেক্ষা করছিলাম। এ হঠাৎ এসে বললো, আমি বিয়ে করবো কিনা! অমনিই আমি উতলা হয়ে উঠলাম! এ ভাবতেই লজ্জা লাগলো। কিন্তু যখন সে প্রশ্ন করলো আমরা কবে বিয়ে করতে পারি! আমি বলে উঠলাম, তুমি চাইলে আজই করতে পারি!
আমার কথায় সে হাসলো। বললো, আমরা যদি আরো কিছুদিন পর বিয়ে করি? ‘কতদিন?’ আমি প্রশ্ন করার আগেই সে বললো, মানে বছর দুই। কারণ তো তুমি বুঝোই। আমার কাজ! এই মুহুর্ত বিয়ে হলে সব এলোমেলো হয়ে যাবে।
আমি কিছু একটা বলতে গিয়ে গুছিয়ে উঠতে পারলাম না। বলতেই পারলাম না, ঠিক আছে। তা কোন সমস্যাই না। এটা কি কোন ভয়ের কারণে? আমি তাও বুঝলাম না। শুধু হালকা হাসলাম। বুঝতে পারলাম, এর মানে এখন সে এই বিষয়টা কাউকে জানাতেই পারবে না যে, তার একজন প্রেমিক আছে। সেই প্রেমিকটা কোন মিডিয়ার সৃষ্টি না, সত্যিই প্রেমিক। বিষয়টা হঠাৎ করে আমার কাছে হাস্যকর মনে হতে লাগলো। কেন আমি ঠিক বুঝলাম না। আমি একদম চুপ হয়ে গেলাম।
আমাকে চুপ থাকতে দেখে সে আমার হাত তার হাতে নিলো। কেন যে বলে উঠলো, তোমার কি ভয় হচ্ছে? এটা আমাকে খুব ভালভাবেই আঘাত করলো। ইচ্ছে হল গাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। এক অদ্ভুত অভিমান আমাকে গ্রাস করলো। যাকে কোনোভাবেই সংজ্ঞায়িত করতে পারলাম না। আমি কেন জানি তার হাতদুটি চেপে ধরলাম। নিজেকে অসুস্থ মনে হল। এই বিষয়টা আমার কল্পনাতীত ছিল, কেন এমন হচ্ছে। কিন্তু কিছু বলতে পারছি না। অনেক কথা বুকের মধ্যে এসে আটকে আছে। এক ধরনের ঐতিহাসিক বিবমিষবোধ আমাকে চেপে ধরেছে।
কি ভেবে সে শুধু আমার মাথা তার ঘাড়ে টেনে নিল। এমন যে তার কিছুই করার নেই। কোনোভাবেই তার এই সিদ্ধান্ত বদলাবে না। তার অবশ্যই সময় দরকার। সে তার কাজে আরও অনেক স্বাধীন হতে চায়। সেই স্বপ্ন এখনই মারতে চাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ-ই যেন আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন জেগে উঠলাম দেখি ঝুমা হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বলল, তুমি আমার সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছো তাই না? এ জন্যই আমার কাছে কখনও যাওনি?
এ কথায় আমার হাসি পেল। কেন জানি উচ্চস্বরেই হেসে উঠলাম। শেষে বললাম, এরা তো কতকিছুই বলে। আমি আর কিছু বলার আগেই ঝুমা বললো, আমি যদি আজ তোমার বাসায় থেকে যাই!
আমি কেন জানি বলে উঠলাম, না। আমি আপাতত চাচ্ছি না তুমি আমার বাসায় আজ থাকো। কেন সেটাও বলতে পারবো না। এই বলেই মনে হলো, এটা বলা কি উচিৎ হল? কিন্তু আমার আর কিছু কী বলার ছিল? ভাবতে লাগলাম।
ঝুমা কিছু বললো না। শুধু হাসলো। কেন হাসলো তা অবশ্য বুঝলাম না। তা, হাসিও একই রকম। তবে কি এমনিই বলেছিল? আবার নতুন প্রশ্ন আঘাত করলো। নিজেকে বিরক্তিকর লাগলো। হঠাৎ এমন জটিলতায় পেঁচিয়ে গেলাম কেন? এভাবে চিন্তা করছি কেন? এমন তো হয় না আমার?
হঠাৎ করে মনে হল, এখন সে যদি বলে চলো কাল বিয়ে করি, তাহলেও হয়তো আমি মানা করতে পারি। এখানে এমন একটি ব্যবধান দানা বাঁধতে শুরু করলো তা ঠিক বুঝতে পারলাম। কিছু কথা বলতে ইচ্ছে হল কিন্তু বলতে পারলাম না। ও কিছু বলছে না কেন? ভাবতে লাগলাম। হঠাৎ সে বললো, দেখো, আমি এত বছর পরিশ্রম করেছি। এখন হঠাৎ বন্ধো করে দেবো? আর অনেক কিছু ভেবে আজ এসেছিলাম। ভেবেছি তুমি বুঝবে। কিন্তু তুমি রেগে গেলে। এর কারণ হয়তো কিছুটা বুঝেছি। তুমি বলতে চাচ্ছো তবে এখনি কেন এলাম? কারণ এসেছি বাধ্য হয়েই। মনের মধ্যে একটি বিশাল চাপ অনুভব করছিলাম। সেদিন প্রথম দেখা না হলে হয়তো হতো না। তাছাড়া তোমাকে এমন দেখে কোনোভাবেই না এসে পারিনি। আর তুমি তো জানোই সে জগৎ বালুর বাঁধের মত। ফলে একটি অস্থির অবস্থা আমাকে আঁকড়ে ধরেছিল। আমি তা থেকে মুক্তি চেয়েছি। ভেবেছি ধীরে ধীরে সবাইকে জানাবো আমাদের কথা। এখনি জানালে সমস্যা তো হবেই। আর তুমি যে কাহিনীগুলো খবরের কাগজে পড়েছো তা পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়। আমাকে মাঝে মাঝেই অভিনয় করতে হয়েছে। এটা বাধ্য হয়েই করতে হয়েছে। সেই কাহিনীগুলো একদিক থেকেই ছিল। আমি ছিলাম শুধু পুতুল মাত্র।
কথাগুলো টানা বললো। এমন ড্রামাটিক আলাপে আমি কি বলবো বুঝতে পারলাম না। মনের অজান্তেই বলে ফেললাম, ঠিক আছে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে এখানে তুমি অভিনয় করছো না। এটা সত্যিই তুমি। - এ বলে মনে হল, ঠিক বলেছি। কিন্তু আমার কথা শুনে ওর চোখ দিয়ে এবার অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। ভাবলাম, সত্যিই আমরা প্রেমিক প্রেমিকা হয়ে উঠেছি। আমাদের হাজার বছরের প্রেম। ভাবতে ভাবতে বুঝলাম এবার ওর চোখ মুছে দেয়া উচিৎ। হাত দিয়ে চোখ মুছে দিলাম। তবে মনে হল, চোখে চুমু খেলেই হত। কিন্তু কেন যেন চুমু খেলাম না। কিন্তু বুঝলাম সে আমার বুকে মুখ লুকাতে চাচ্ছে। অন্তত আমার এই ইচ্ছেই হল। তাই করলাম। কেন জানি না ও হেসে উঠলো। আমিও হাসলাম। হাসতে হাসতে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরলাম।
একসময় বৃষ্টি শুরু হলো। আমি ভাবলাম আমার বাসাতেই যাওয়া যাক। ড্রাইভারকে তাই বললাম। কারন ঝুমা ঘুমিয়ে পড়েছিল। বিষয়টা অবশেষে খুব মজার হল। দুজনেই খুব ঘুমালাম। বাসায় সামনে এসে যখন গাড়ি থামলো, ঝুমা চোখ মেলে তাকালো। হঠাৎ সে ব্যাগ থেকে দুইটা আংটি বের করলো। একটি নিজের হাতে নিলো। আরেকটা আমাকে দিল। বললো, পড়িয়ে দাও।
আমি হেসে বললাম, এখানে? সেও হাসলো। ‘হোটেলেই ভেবেছিলাম। কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেল।’ আমরা গাড়িতে বসে আংটি বদল করলাম। বিষয়টা খুব মজার হল, ভাবলাম। ইচ্ছে হল ওকে কোলে করে উপরে নিয়ে যাই। কিন্তু সামনে দাড়োয়ান ছিল। তাছাড়া ড্রাইভার। ড্রাইভারকে সে বাসায় চলে যেতে বললো। বললো, কাল দশটার দিকে যেন চলে আসে। আমরা যখন সিঁড়ির উপর উঠলাম তখন চারদিক অন্ধকার। কেউ আমাদের দেখছে না। আমি কিছু না বলেই ওকে কোলে তুলে নিলাম। ও হেসে উঠলো। তবে সাথে সাথে মুখ চেপে ধরলো। আমি তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস ফিস বললাম, হেসো না, ভূত জেগে উঠবে!
About the Author
Sham Pulok