অধ্যায়-২: কাঁচের দেয়াল
Excerpt
তবে মানুষ তো মারা যায়ই। আমি তার চেঁচামেচি শুনে মাঝে মাঝে এই ভাবি। ইচ্ছে হয় তাকে কিছু বলে আসি। কিন্তু এই ভয়ে কখনো যেতে পারিনি, যদি আমার কথা শুনে আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠে। তবে বাড়িওলা লোকটা খুব শান্ত। সবসময়ই হাসিমুখে কথা বলে। সে যেহেতু জানে আমি ভাল চাকরি করি। তবে কেউ নেই কেন? এ তার মত। হয়তো এজন্যই এ কথা বলেছেন। শেষে মাথার মধ্য থেকে তার ভাবনার ইতি টানতে চাইলাম।
কাঁচের দেয়াল
বিষয়টা এমন যে আমি দিনের পর দিন আশা করতে লাগলাম যে ঝুমার সাথে দেখা হবে। কিন্তু এমন একদিন দেখা হলো যেদিন দেখা হবার কথা কল্পনাই করতে পারিনি। এরপর এমন আশা করতে লাগলাম সে একদিন বাসায় আসবেই। যেহেতু সে অনেকটা জোর দিয়েই বাসার ঠিকানা নিয়েছিল। কিন্তু এক মাসেও তেমন কিছু পেলাম না। তবে এমন নয় যে সারাক্ষণ আমি এই বিষয়টা নিয়েই ভেবেছি। কিন্তু একটা বিষয়ের জন্য নিজের প্রতি খুব রাগ লাগছিল। কেন আমি হঠাৎ চুমু খেতে গেলাম! সেই জন্যই হয়তো আর আসবে না। সাথে সাথে হয়তো তার তেমন রাগ লাগেনি। বাসায় গিয়ে খুব রেগেছিল বোধ হয়। তবে এসব ভাবনার কোন আগামাথা নেই, এ আমি খুব জানতাম। কারণ এমন নয় যে আমি চিরকাল তার আশায় পথ চেয়ে বসেছিলাম। শুধু এটুকু জানতাম একদিন হয়তো দেখা হয়েই যাবে। যেহেতু পৃথিবী খুব একটা বড় না। এ জন্য কিছু বিষয় ভেবে রেখেছিলাম। ব্যাপারটা এক ধরণের পাগলামিই বলা যায়।
তবে দিন স্বাভাবিকভাবেই চলেছে। অফিস থেকে শুরু করে সবখানেই। ভিন্ন রকমের যেটুকু ঘটেছে তা হল কয়েকদিনের মাথায়ই উঁকি দেয়া সেই মেয়েটার প্রতি খুব উৎসাহ বোধ করেছি। বলা যেতে পারে তারপর প্রায়ই নিজে যেচে গিয়েই কথা বলেছি। তবে এমন নয় মেয়েটা চাচ্ছে না। কিছু দিনের মাথায়ই এমন হলো মন বিনিময়ের একটা ধারা বারান্দায় প্রবাহিত করে দিল। তা আমার ভালই লাগতো। একদিন হঠাৎ আমাকে সে চড়ুই পাখি বলে ডাক দিল। যদিও তার কণ্ঠে এই ডাকটা ভালই লাগলো কিন্তু তারপরও নিজেকে এমন ছোট নিরীহ পাখি মেনে নিতে পারলাম না। তাছাড়া আমিতো কোনভাবে এমন কিচিরমিচির করি না। তবে এ ঠিক প্রতিদিন সকালেই এমন পাখি বারান্দায় খেলা করতো। সকালে আমার ঘুম ভাঙলেই আমি তাদের কিচিরমিচির শুনতে পেতাম। কি আর করা এ ডাক শুনে কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমি হালুম বলে দিলাম। মানে উচ্চস্বরে হেসে উঠলাম।
তবে এটা নিয়ে যে খুব বেশি এগিয়ে যাওয়া উচিৎ হবে না তা বুঝেছিলাম। তাই কি সব ভেবে হঠাৎ উৎসাহে ভাঁটা পড়লো। যদিও তার উচ্ছ্বাসভরা কথোপকথোন আমাকে খুব টেনেছিল। যেহেতু জীবনে এক ধরণের একঘিঁয়েমি চলে এসেছিল তাই এমন অদ্ভুত চঞ্চলতা খুব টানছিল। কিন্তু যখন চুমু বিনিময়ের উপক্রম তখন বারান্দায় যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। অফিস থেকে দেরি করে ফিরতে লাগলাম। এমন হত রাতে খুব একটা লাইট পর্যন্ত জ্বালালাম না।
এর মধ্যে হঠাৎ মা এসে যেন আমাকে উদ্ধার করলেন। বহুদিন পর মায়ের সান্ন্যিধ্য খুব ভাল লাগলো। ফলে দেখা গেল মাকে যেহেতু বারান্দায় দেখা গেল হয়তো সে বুঝবে এই জন্যই আমি ঠিক যাচ্ছি না। এসব ভেবে নিজের স্বাভাবিক কাজ আবার একইভাবে করতে লাগলাম। পরে মা যখন ফিরে গেল তখন দেখা গেল আমি আবার আমার আগের জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সন্ধ্যার পর হাঁটতে বের হয়েছি। কাদেরের দোকানে চা খেয়েছি। তার সন্তানের খবর নিয়েছি। তবে সেই বিষয়টা আর তুলিনি। তবে একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি সে এখন আগের থেকে অনেক বেশি হেসে আমাকে চা দেয়, কথা বলে। বুঝেছি, সেদিনের সেই টাকাটা তাকে উপকারই করেছে।
আরেকটা মজার বিষয় ঘটিয়েছি। তা, সেদিন ঝুমার সাথে যেই সময়ে দেখা হয়েছিল ঠিক সেই সেই বার আমি সেখানে গিয়েছি। তখন মনে মনে ভেবেছি কেউ এসে নাম ধরে ডাক দেয় কিনা। কিন্তু তেমন কিছু ঘটেনি। কিন্তু অন্য এক মেয়ের সাথে দেখা হয়েছে। সে এমন বললো যে আমি চাইলেই সে আমার বাসায় চলে আসবে। আমি বললাম, তুমি গান জানো? আমাকে গান শুনাবে?
এ প্রশ্নে সে কিছুটা পাগলের মত হাসি দিল। তবে আমার তা খুব একটা খারাপ লাগলো না। বললো, সে শুধু গান না, নাচও জানে। এমনভাবে বললো এখনই নাচ শুরু করবে। কিছু না ভেবেই আমি তাকে আমার বাসার ঠিকানা দিয়ে দিলাম। বললাম তুমি ইচ্ছে করলে চলে যাও বাসায়। আমি কিছুক্ষণ হাঁটবো, তারপর ফিরবো।
আমার কথায় কি ছিল বুঝলাম না। সে কোনোভাবেই বিশ্বাস করলো না। কি ভেবে বাসার চাবিটা দিতে গেলাম। অমনি সে পিছিয়ে গেল। সাপ দেখলে যেভাবে মানুষ ভয় পায় সেভাবে। বলে উঠলো, আমাদের এতো বিশ্বাস করতে নেই। তারপর কিছুটা অদ্ভুতভঙ্গিতে বললো, আপনাকে আমার খুব ভাল লেগেছে। তাই এভাবে রাতে যাবো না। যদি কোনোদিন সময় হয় চলে যাবো। তবে দিনের আলোয়।
উচ্চস্বরেই বলে উঠলাম, যার নিজের মধ্যে আলো আছে তার দিনের আলোর কি দরকার! আমি দিনের আলো পছন্দ করি না। বলার পরই মনে হলো এমন কথা বলা কি ঠিক হলো? মনে হয় না। তবে এ ঠিক আমি রাতই পছন্দ করি বেশি। তবে আমার কথা তার পছন্দ হলো। হাসলো। তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে বললো, আমার নাম পাপিয়া। যদিও এ নাম কাউকে বলি না। এ জন্য বলছি যে দিনের আলোয় তো আমাকে চিনবেন না। এ নাম বললে যেন চেনেন।
তারপর হঠাৎ হাঁটা শুরু করলো। আমিও কেন যেন পিছু নিলাম। তবে তা ক্ষণিকের জন্য। তারপর থেমে দাঁড়িয়ে পড়লাম। পাপিয়া হঠাৎ পেছনে ফিরে হাসলো। তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল- অন্ধকারে, যা আমার খুব পছন্দ।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি ভাবতে লাগলাম, তাকে কিছু টাকা দেয়া অবশ্যই উচিৎ ছিল! কিন্তু কেন তা বলতে পারলাম না। তাকে তো চাইলে এক দিনের জন্য মুক্তি দিতে পারতাম। কিন্তু কি হত তাতে? যেখানে পৃথিবীতে আমরা সবাই বন্দি। কেউ একজন মুক্তি পেল বা না পেল তাতে কি এসে গেল! কিন্তু তবুও তো কিছু হতো! নিজেকে অনেক অশান্ত লাগলো। তবে এ আমি খুব করে বুঝি পৃথিবীতে অন্যকে সাহায্য করতে যাওয়া নিঃসঙ্গতা থেকে উদ্ভূত।
তবে একসময় এমন মনে হলো যদি তাকে কিছু দিতে যেতাম হয়তো নিজেকে অনেক ছোট করা হত। সেদিনের কাদেরর চায়ের কথা মনে পড়লো। শেষে সেদিন যখন বাসায় ফিরছিলাম অবশেষে ভালই লাগলো। মনে হল বাসায় গিয়ে ভাল একটি ঘুম হবে।
নেটে ঝুমার নতুন কিছু ছবি দেখেছি। খবরের কাগজে তাকে নিয়ে কিছু খবরও পড়েছি। তেমন আগ্রহ নিয়ে দেখতে পারিনি। মনের মধ্যে এক ধরনের বোকাটে অভিমান কাজ করেছে। এটাকে আমি বোকাটে অভিমানই বলি। কারন এর কোন মূল্য নেই। তবে সেদিন বাড়ির মালিক বললো, আমি চাইলেই যে কাউকে বাসায় আনতে পারি। এটা অবশ্য আমি জানি আমি চাইলেই পারি। কিন্তু তিনি কেন বললেন তা বুঝতে পারলাম না। পাশের বাসা থেকে কি কেউ কিছু বলেছে তাকে? মনের মধ্যে ঘোর সন্দেহ হল। হতে পারে। তারপর মনে হল তিনি হয়তো আমার একাকিত্ব নিয়ে চিন্তিত। কারণ বৃদ্ধ বয়সে তিনি অনেকটা একা। এক ছেলে কানাডা চলে গেছে। খুব একটা আসে না। মেয়ে আমেরিকা। তার স্ত্রী সেখানেই বেশি থাকে। খুব কমই দেশে আসে। দেশে আসলে তিনি খুব হাহুতাস করেন। মাঝে মাঝে আমি চিৎকার শুনি, এ দেশে কি মানুষ বাস করে? কাকে কখন মেরে ফেলা হলো ঠিক নেই!
তবে মানুষ তো মারা যায়ই। আমি তার চেঁচামেচি শুনে মাঝে মাঝে এই ভাবি। ইচ্ছে হয় তাকে কিছু বলে আসি। কিন্তু এই ভয়ে কখনো যেতে পারিনি, যদি আমার কথা শুনে আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠে। তবে বাড়িওলা লোকটা খুব শান্ত। সবসময়ই হাসিমুখে কথা বলে। সে যেহেতু জানে আমি ভাল চাকরি করি। তবে কেউ নেই কেন? এ তার মত। হয়তো এজন্যই এ কথা বলেছেন। শেষে মাথার মধ্য থেকে তার ভাবনার ইতি টানতে চাইলাম।
কিছুদিন পর হঠাৎ পাপিয়া মেয়েটা এসে হাজির। বাসায় নক করে বললো, সে পাপিয়া। দরজা খুলে আমি সত্যিই অবাক হলাম। তাকে একদম বাচ্চা মেয়ের মত লাগছে। হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কোন প্রশ্ন না করে ভেতরে আসতে বললাম। ভিতরে আসার পর আমি তাকে বসতে দিলাম। কিন্তু কি বলবো বুঝতে পারলাম না। সেও কিছু না বলে কক্ষের চারদিকটা দেখছিল। তারপর হঠাৎ কিছু না বলেই ঘরটা গোছাতে শুরু করে দিল। ‘এই কি করো? প্রথম দিন এসেই কাজ শুরু করলে?’ আমি বলে উঠলাম।
তাই বলে এমন নোংরা ঘরে বসে থাকবো? হেসে এই প্রশ্ন করলো। কিন্তু কোথাও নোংরা কিছু দেখলাম না। আমার কিছু জামাকাপড় অবশ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিছু বইও। তবে সেগুলোকে তো কোনোভাবেই নোংরা বলা যায় না। মা আসলেও এমন হয়। তিনি আমার কাপড় আলমারির ভিতর এমন ভাবে গুছিয়ে রাখেন দেখতেই বেখাপটা লাগে। পৃথিবীতে আমাকে এত সব নোংরা জিনিস দেখতে হয় যে, এমন অগুছালো অবস্থাই মানান সই মনে হয়। বললাম, তুমি সবকিছু গুছিয়ে ঘরটাকে এমন করে ফেলবে যে দেখতে অদ্ভুত লাগবে। সেটা কোনোভাবেই আমার মত মানুষের সাথে খাপ খাবে না।
আমার কথা শুনে সে হাসলো। তবে তার কাজ থামালো না। কাজ করতে করতেই হঠাৎ জানালো সে রাতে এখানে রান্না করবে। কি খেতে চাই। আমি কিছু না ভেবেই বলে উঠলাম, তুমি যা ভাল রান্না করতে পারো।
সে কিছু না বলে তার ব্যাগ থেকে একটি বাজারের লিস্ট বের করলো। দেখে আমি জোরে হেসে উঠলাম। তবে সে এমনভাবে তাকালো যে আমি বেশিক্ষণ হাসতে পারলাম না। ইচ্ছে হল লিস্ট নিয়ে বের হয়ে পড়ি। তেমন কিছু না বলেই বের হয়ে গেলাম। যাবার পথে ভাবতে লাগলাম এই মেয়ে বাসা থেকে লিস্ট করে নিয়ে এসেছে। অদ্ভুত লাগলো বিষয়টা। তবে জীবনটা অদ্ভুত কিছুই। তাই সেটা নিয়ে তেমন ভাবা ঠিক হবে না। তবে পাপিয়াকে আমার ভাল লেগেছে। তার চোখে মুখে এক ধরণের প্রাণশক্তি আছে। যা শুধু আমি ঝুমার চোখেই দেখেছিলাম। তবে এটা যে তাকে ভাল লাগার কারনে হয়েছে তা হতে পারে। এটা ভেবে অবাক হলাম হঠাৎ, তাকে ভাল লাগবেই বা কেন? উত্তর সাথে সাথেই পেয়ে গেলাম নিঃসঙ্গ মানুষের সবাইকেই ভাল লাগে। অন্তত কাউকেই খারাপ লাগে না। আজকাল নিজেকে এমন নিঃসঙ্গ ভাবি কেন? এই প্রশ্নটা মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগলো। তবে যখন আমি মাংসের দোকানের সামনে গেলাম তখন মাথায় অন্য চিন্তা ঢুকলো। সেই চিন্তাটা এর থেকে ভাল লাগলো। গরুর মাংস খুব সুন্দরভাবে সাজানো। দেখতে ভালই লাগছে। যদিও শুকরের মাংস হলে এত সুন্দর লাগতো না। তবে মজার বিষয় হলো, ভারতের বেশিরভাগ মানুষ এই মাংসটা খেতে পারে না। হয়তো খুব একটা চায়ও না। যেমন আমরা শুকরের মাংস খেতে চাই না। কোরিয়ানরা কুকুরও খায়। নাহ! এসব ভাবা আমার ঠিক হচ্ছে না। আসলে খুব একটা ভালও লাগছে না। হঠাৎ মনে হল হিন্দু ধর্মে গরুকে যেখানে মা বলা হয়েছে সেখানে ছাগলকে অন্তত মামা বলতে পারতো। তাহলে অন্তত ছাগলরা বেঁচে যেত। অবশ্য সবখানে না। শুধু যেখানে হিন্দু আছে। হঠাৎ আরো অদ্ভুত একটি চিন্তা মাথায় এলো। সেটাকে অনেকটা বৈজ্ঞানিক চিন্তা বলা যায়। তাই ভাবতে আমার ভালই লাগলো, মাঝে মাঝে যেমন অনেক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে দেখা যায় যেখানে কেউ একজন অমর হবার কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছে। ফলে দেখা যায় এমন যে সে চার-পাঁচশো বছর ধরে বেঁচে আছে। কোনোভাবেই মরছে না। তখন লোকটি মরার জন্য আকুতিমিনুতি জানাতে লাগলো। মরে যাবার জন্য প্রার্থনা করতে লাগলো। এ অবশ্য ঠিক সে আত্মহত্যা করবে না। যেহেতু এটা মহাপাপ। এখন এমন যদি হত যে গরু মা তাই গরু খাওয়া যাবে না। তাছাড়া ছাগল মামা তাও খাওয়া যাবে না। এমনকি শুকরও না। তখন এই প্রানীগুলো কি করতো। বৃদ্ধ হয়ে বছরের পর বছর টিকে থাকতো। প্রার্থনা করতো, আমাকে কোনভাবে নিয়ে যাও। ভাবলাম বিষয়টা খুব মজার। কিন্তু কিছুক্ষন পর মনে হল, এমন ভাবা আসলে ঠিক হয়নি। কেন? নিজেকেই প্রশ্ন করলাম। আমি তো শুধু ভেবেছি। কাউকে তো বলতে যাচ্ছি না! কারো সাথে এ নিয়ে তর্কও করতে যাচ্ছি না। নিজেকে বুঝালাম। এ ভাবতে ভাবতে দেখলাম, দোকানদার দুই কেজি মাংস আমাকে দিয়ে দিল। ভাবলাম, ভাগ্যিস মানুষ খুব দ্রুত ভাবে!
বাজার করে আমি যখন বাসায় পৌছলাম দেখি আমার ঘরটা সে নতুন বউয়ের মত ঝকঝকা ফকফকা করে ফেলেছে। দেখি পাপিয়া টিভি ছেড়ে তার সামনে বসে আছে। সেখানে একটি যুবকের অত্মহত্যার খবর দেখাচ্ছে। আমি হেসে বললাম, এসব কি দেখছো? বাদ দাও।
কিন্তু সে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে। তারপর হঠাৎ উঠে গেল, রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। কিন্তু আমি ঐ ছেলেটার কথা ভাবতে লাগলাম। ছেলেটার জেল হয়েছিল। আমার জানা মতে সাত বছরের কারাদণ্ড। কারণটা কিছুটা আজব। সরকারের উচ্চপদস্থ কাউকে গালি দিয়েছিল। গালি দেয়া বলতে বিরুদ্ধে কিছু বলাও হতে পারে। এমন কি অভিশাপ দেয়ার মত কিছুও হতে পারে। আমি ঠিক জানি না। হয়তো কোন মন্ত্রীকে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও হতে পারে। আমি সে বিষয়ে খুব একটা উৎসাহ বোধ করিনি। তবে এটুকু বুঝেছি যুবকটি মত প্রকাশের অধিকার চাচ্ছে। তবে এ নিয়ে আমি তেমন ভাবছি না। আমি ভাবছি মেয়েটার কথা। হঠাৎ করে সে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। তবে বিষয়টা ভালই লাগছে। যদিও এ জানি মাঝরাতে যার সাথে পরিচয় এমন একটি মেয়ে এভাবে বাসায় চলে আসার কথা কেউ জানলে ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি হবে। কিন্তু জানবে কীভাবে? নিজেকে বললাম। হঠাৎ পাপিয়াকে বললাম, তুমি যে এভাবে কষ্ট করছো কিন্তু দেখে তো মনে হচ্ছে তোমার খুব আনন্দ হচ্ছে!
আমার কথায় সে মিষ্টি করে হাসলো। আমি আবার প্রশ্ন করলাম, তুমি কি থেকে যাবে? সে সাথে সাথেই না বলে দিল। তা আমি ভাবতেই পারিনি। কেন? আমি জানতে চাইলাম। অদ্ভুত ধরণের একটি হাসি দিল। তারপর বললো, আমি তো থাকতে আসিনি। চলে যেতে এসেছি।
বাহ! খুব ভাল বলেছে, আমি ভাবলাম। আমরা তো কেউ থেকে যেতে আসিনি। এসেছি চলে যেতে। কোন না কোনভাবে আমরা চলে যাব। তবে কাছাকাছি কিছুক্ষণ থাকা যেতে পারে। আমি এই বললাম, আমরা পাশাপাশি কিছুক্ষণ থাকতে পারি। সে কিছুটা বোকার মত লজ্জা পেল। এটা আমি আশাই করিনি। অন্তত তার কাছে।
তবে সবচেয়ে মজার বিষয় ঘটেছে খাবার সময়। সে এমন ভাব করছিল যেন আমি কোন মধ্যযুগীয় জমিদার আর সে আমাকে খাওয়াতে খুব আন্তরিক। পরে এমন মনে হল আমি প্রাচীন কালের কোন বৌদ্ধভিক্ষুও হতে পারি যাকে খুব সাদরে রাজবাড়িতে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। আর রানি নিজহাতে আমাকে খাওয়াচ্ছেন। এই অত্যাচার আমার বেশিক্ষণ সহ্য হল না। তাকেও বসিয়ে দিলাম খাবার সামনে দিয়ে। সে তখন মাথা নিচু করে খেতে লাগলো। মনে হলো এখনি রাগে ফেটে পড়বে। তবে তেমন কিছু হলো না। খাওয়া শেষ হলে বললাম, আজ থেকেই যাও। পরক্ষনেই কি ভেবে বললাম, আমার কিন্তু অতিথিদের জন্য কক্ষ আছে!
তবে সে থাকার চিন্তা করছে বলে মনে হলো না। তবে কিছু একটা চিন্তা করছে তা বুঝলাম। কিন্তু হঠাৎ আমার দিকে তাকালো, এমনভাবে আমার ভয় লাগলো। আমি উঠে দাঁড়িয়ে বারান্দার দিকে গেলাম। দেখি সেই উঁকি দেয়া মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ হাসতে গিয়েই আঁটকে গেলাম। তবে পুরোটা না। হালকা শব্দ হয়েছিল। আমি সাথে সাথেই ভিতরে চলে এলাম। আমি ভিতরে আসতেই পাপিয়া বললো, তুমি চাইলে গান শোনাতে পারি। তবে নাচটা একটু বাড়াবাড়িই হবে।
কিন্তু আমার ইচ্ছে হলো বাড়াবাড়িই হোক। তবে বললাম, হুম গান শোনা যেতে পারে। আমি জানালাগুলো বন্ধ করে দিলাম যেন শব্দ বাইরে না যায়। একটা অদ্ভুত ধরণের গান শুরু করল। না। সে গান আগে কোনোদিন শুনিনি। অনেকটা পাহাড়ি অঞ্চলের সুর। সে কি পার্বত্য এলাকার? গান শুনে মনে এ প্রশ্নই জাগলো। তবে তাকে মোটেই পাহাড়ি মানুষের মত মনে হয়নি। অন্তত দেখতে। আমার মনে হল, এই গান শোনার ব্যাপারটাও মধ্যযুগীয় কোন জমিদারের মত হল। হাস্যকরই বলা যায়। আরও হাস্যকর যা হল, এবার গান শেষ হলে আমি তার হাত ধরে বসলাম। কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললো, অনেক রাত হল। আমাকে যেতে হবে।
না চাইতেও এই ভাবনা মাথায় এলো, রাত হলে তার কি! কিন্তু সে উঠে দাঁড়ালো। বললো, সময় পেলে আবার আসবে। যদিও আমি আর আশা করতে চাইলাম না। কিছু বলা উচিৎ ছিল কিন্তু তা বলতে পারলাম না। মনে হল কি থেকে কি বলে ফেলি। এখানে জীবনের কাঁচ অনেক মসৃণ আর পিচ্ছিল। এখানে আঘাত দেয়া খুব সোজা। তাই আমাকে চুপ থাকতে হল। সে বললো, এমন নোংরা না থাকতে। নিয়মিত বাসাটা পরিষ্কার করে রাখতে। তা বেশ। অন্তত খাওয়াদাওয়ার জন্য কিছু বলেনি। আমার খুশিই লাগলো। সে চলে যাওয়ার পর হঠাৎ আমার ঘুম চলে আসলো। যদিও তত রাত হয়নি।
About the Author
Sham Pulok